আজ ৭ ফাল্গুন ১৪২৩, রবিবার

মলয় রায়চৌধুরী

মলয় রায়চৌধুরী (জন্ম: ২৯ অক্টোবর, ১৯৩৯) বিশিষ্ট বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং সর্বোপরি হাংরি আন্দোলন তথা বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জনক। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। প্রচণ্ড বৈদুতিক ছুতার কবিতাটির জন্য গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন।

পারিবারিক পরিচয়ঃ
সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতা খ্যাত সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের উত্তরপাড়া শাখার সন্তান। পিতা রজ্ঞিত রায়চৌধুরী (১৯০৯-১৯৯১) ছিলেন চিত্রশিল্পী-ফোটোগ্রাফার। মা অমিতা (১৯১৬-১৯৮২) ছিলেন পাণিহাটিস্থিত নীলামবাটির কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর (রোনাল্ড রস-এর সহায়ক) জ্যেষ্ঠ কন্যা। কলকাতার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিষদ কর্তৃক সংরক্ষিত সংগ্রহশালার (মিউজিয়াম) তথ্য অনুযায়ী মলয় রায়চৌধুরীর ঠাকুর্দা লক্ষীনারায়ণ ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম ভ্রাম্যমান ফোটোগ্রাফার-আর্টিস্ট।

শিক্ষা এবং কর্মজীবনঃ
পাটনার সেইন্ট জোসেফ কনভেন্টে প্রাথমিক এবং রামমোহন রায় সেমিনারিতে ম্যাট্রিকুলেশানের পর অথ্রনীতিতে সাম্মানিক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, এবং গ্রমীণ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ রূপে প্রশিক্ষনের পর প্রথমে রিজার্ভ ব্যাংক ও তারপর এঅরডিসি এবং নাবার্ডে গ্রামীণ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞের উচ্চপদে ভারতের বিভিন্ন শহরে ১৯৯৭ পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন ।যুগশঙ্খ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের রিডার ড. শঙ্কর ভট্টাচার্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন যে মলয় রায়চৌধুরী সমগ্র জীবন ভারতের চাষি, তাঁতি, জেলে ও হস্তশিল্পীদের মাঝে কাটিয়ে প্রভূত অভিজ্ঞতা লাভ করেন, এবং তা তাঁর সাহিত্যকর্মে গভীর প্রভাব ফেলেছে ।

হাংরি আন্দোলনঃ
১৯৬১ সালে দাদা সমীর রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং হারাধন ধাড়ার (দেবী রায় ) সঙ্গে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করে আবির্ভাবেই সাড়া ফেলে দেন । তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতায় প্রায় চল্লিশজন কবি, লেখক ও চিত্রশিল্পী এই আন্দোলনে যোগ দেন, যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বিনয় মযুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, ফালগুনী রায়, অনিল করঞ্জাই, রবীন্দ্র গুহ প্রমুখ । এই আন্দোলনের মুখপত্র হিসাবে এক পাতার বুলেটিন প্রকাশ করা হতো । ১০৮টি বুলেটিন প্রকাশ করা হয়েছিল, যার মাত্র কয়েকটি 'লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি' এবং ঢাকা বাংলা একাডেমিতে সংরক্ষণ করা গেছে । ১৯৬৫ পর্যন্ত এই আন্দোলন পুরোদমে চলেছিল; বিখ্যাত হাংরি মকদ্দমার পর তা ভেঙে যায় । আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বি.দে মলয় রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন বিষয়ে ৩৫০ পৃষ্ঠার গবেষণাপত্রের জন্য পিএচ.ডি. সন্মান দ্বারা ভূষিত হয়েছেন । ২০১৩ সালে হাংরি আন্দোলন নিয়ে আইআইটি খড়গপুর থেকে পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক রিমা ভট্টাচার্য । ১৯৯৭ সালে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাংরি আন্দোলন নিয়ে পিএইচডি করেছেন অধ্যাপক উদয়নারায়ণ বর্মা ।

প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতারঃ
১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত 'প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতাটির জন্য মলয় অশ্লীলতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং ৩৫ মাসব্যাপী কোর্ট কেস চলে । কলকাতার নিম্ন আদালতে সাজা ঘোষণা হলেও, ১৯৬৭ সালে উচ্চ আদালতে অভিযোগমুক্ত হন । মলায়ের পক্ষে সাক্ষী ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ সান্যাল, জ্যোতির্ময় দত্ত এবং সত্রাজিত দত্ত । মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষী ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, পবিত্র বল্লভ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু । মকদ্দমা চলাকালীন মলয়ের খ্যাতি আমেরিকা ও ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে, এবং বিভিন্ন ভাষায় এই কবিতাটি অনুদিত হয় । ৪৫ বছর পরও কবিতাটি নিয়ে বিতর্ক কবিতাটিকে জীবন্ত রেখেছে, এবং এম ফিল ও পি এইচ ডি গবেষণার বিষয়বস্তু হয়েছে । গবেষণা করেছেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক কুমারবিষ্ণু দে ও রবীন্দ্রভারতী থেকে অধ্যাপিকা স্বাতী বন্দ্যোপাধ্যায় । ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত 'Modern And Postmodern Poetry Of The Millenium' সংকলনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে অন্তর্ভূক্ত এইটিই একমাত্র কবিতা বলে ভূমিকায় জানিয়েছেন সম্পাদক জেরোম রোদেনবার্গ।

সাহিত্যকর্মঃ
মলয় রায়চৌধুরীর প্রথম কাব্যগ্রন্হ শয়তানের মুখ ১৯৬৩ সালে কৃত্তিবাস প্রকাশনী ধেকে প্রকাশিত হয়েছিল। পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে গ্রন্হটিকে একটি জলবিভাজক বলে মনে করা হয়। মলয় তাঁর প্রতিটি কাব্যগ্রন্হে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার কবিতার জনকরূপে বাংলা সাহিত্যে একটি বিশেষ স্হান করে নিয়েছেন। তাঁর কবিতা বাংলাসাহিত্যের সনাতন ঐতিহ্যকে, নিয়মানুবর্তিতাকে, আমূল নাড়া দিয়েছিল। কবিতার ভাষায়, ছন্দে, অলংকারে, চিত্রকল্পে তুমূল ভাংচুর পাঠকের অভ্যস্ত চোখ ও কানকে বিব্রত করেছিল। যৌনতার সংগে তিনি এনেছিলেন ব্যঙ্গ, আত্মপরিহাস ও অসহায় মানুষের নিষগফলতার যন্ত্রণা। উপন্যাস ও ছোটগল্পে তিনি নিজস্ব গদ্য সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর প্রবন্ধকে আপোষহীন বলে মনে করা হয়।

পুরস্কারঃ
২০০৩ সালে অনুবাদের জন্য দেয়া সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার সহ বহু লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন ।

কাব্যগ্রন্থঃ
শয়তানের মুখ (কবিতা ), প্রথম প্রকাশ ১৯৬৩, প্রকাশক : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কৃত্তীবাস প্রকাশনী, ৩২/২ যোগীপাড়া রোড, কলকাতা-২৮
জখম (দীর্ঘ কবিতা), প্রথম প্রকাশ ৯জুন ১৯৬৫ । পকাশক: জাব্রা প্রকাশনী । দ্বিতীয় সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৯৮ । প্রকাশক: উৎপল ভট্টাচার্য, কবিতীর্থ, ৫০/৩ কবিতীর্থ সরণী, কলকাতা ৭০০০২৩ ।
আমার আমীমাংসিত শুভা (দীর্ঘ কবিতা), প্রথম প্রকাশ ১৩ মাঘ ১৩৭১ । প্রকাশক- জেব্রা প্রকাশনী/হাংরি প্রিন্টার্স, কলকাতা
ইস্তাহার সংকলন (হাংরি ম্যানিফেসটো, হাংরি আন্দোলনের সময়ে বিভিন্ন বুলেটিনে প্রকাশিত ইস্তাহার ) । প্রথম প্রকাশ: বইমেলা ১ জানুয়ারি ১৯৮৫
কবিতা সংকলন (আংরি আন্দোলনকালীন ২৬টি কবিতার সংকলন) । প্রথম প্রকাশ: বইমেলা, জানুয়ারি ১৯৮৬ । প্রকাশক: মহাদিগন্ত প্রকাশ সংস্হা, কলকাতা ।
মেধার বাতানুকুল ঘুঙুর (কবিতা) । প্রথম প্রকাশ: ১৯৮৭ ্র প্রকাশক: মহাদিগন্ত প্রকাশ সংস্হা, কলকাতা ।
হাততালি (দীর্ঘ কবিতা) । প্রথম প্রকাশ কৌরব পত্রিকায় ১৯৮৯, গ্রন্হাকারে প্রকাশ ১৯৯১ । প্রকাশক: মহাদিগন্ত প্রকাশ সংস্হা, কলকাতা
চিৎকারসমগ্র ( পোস্টমডার্ন কবিতা) । প্রথম প্রকাশ মে ১৯৯৫ । প্রকাশক: কবিতা পাক্ষিক, ৩৬ডি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০২৬ ।
'ছত্রখান' (অধুনান্তিক কবিতা) । প্রথম প্রকাশ: নভেম্বর ১৯৯৫ । প্রকাশক: কবিতীর্থ, ৫০/৩ কবিতীর্থ সরণি, কলকাতা ২৩ ।
'যা কাগবে বলবেন' (কবিতা) । প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৬ । প্রকাশক: কৌরব প্রকাশনী, ২৫এ এগ্রিকো বাগান, জামশেদপুর ৯ ।
'অ' (কবিতা ও তার অবিনির্মাণ) । নিজের লেখা ২৩টি কবিতার বিশ্লেষণ । প্রথম প্রকাশ: বিমেলা ১৯৯৮ । প্রকাশক: কবিতা পাক্ষিক, ৩৬ডি হরিশ চ্যাটার্জি স্ত্রিট, কলকাতা ২৬ ।
'আত্মদ্ধংসের সহস্রাব্দ' (কবিতা) । প্রথম প্রকাশ: ২০০০ । প্রকাশক: গ্রাফিত্তি, ২এ টিপু সুলতান রোড, কলকাতা-২৬ ।
'প্রকাশ কর্মকারের ছবি মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা' । (বারোটি বুলেটিন) । ১৯৮৫-৮৭ এর মাঝে লখনউ থেকে প্রকাশিত ।
'কৌনপের লুচিমাংস' (কবিতা সংকলন ) । প্রথম প্রকাশ: ২০০৩ । প্রকাশক: কবিতা ক্যাম্পাস, হাওড়া ।
'কবিতা ২০০৪_১৯৬১' ( সব কয়টি কবিতা একত্রে ) । প্রথম প্রকাশ: ২০০৫ । প্রকাশক: আবিষ্কার প্রকাশনী, বাঁশদ্রোনী, কলকাতা ৭০০০৭০ ।


আজ পর্যন্ত এই ওয়েবসাইটে মলয় রায়চৌধুরী এর ১০টি কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

কবিতা কাব্যগ্রন্থ পঠিত মন্তব্য
কুড়িটি হাইকু সংকলিত (মলয় রায়চৌধুরী) ৮৩৫ বার ০ টি
লালসেলাম হায় সংকলিত (মলয় রায়চৌধুরী) ৬৫৯ বার ১ টি
আলো সংকলিত (মলয় রায়চৌধুরী) ৬৮৯ বার ১ টি
আমি ভঙ্গুর হে সংকলিত (মলয় রায়চৌধুরী) ৫৪২ বার ০ টি
দুটি বিশ্ব সংকলিত (মলয় রায়চৌধুরী) ৫৬২ বার ০ টি
মেলাপুরুষ সংকলিত (মলয় রায়চৌধুরী) ৪৬৯ বার ০ টি
কুর্মিটোলা, জেহানাবাদ, ১৯৮৯, সন্ধ্যা সংকলিত (মলয় রায়চৌধুরী) ২১৪ বার ০ টি
এ কেমন বৈরী সংকলিত (মলয় রায়চৌধুরী) ৫৪৩ বার ০ টি
অভ্রপুষ্প সংকলিত (মলয় রায়চৌধুরী) ৬৩৭ বার ০ টি
ঘুণপোকার সিংহাসন সংকলিত (মলয় রায়চৌধুরী) ৭৫০ বার ০ টি