আজ ১৩ আশ্বিন ১৪২৭, মঙ্গলবার

সংসার সমাচার
- শেখ রবজেল হোসেন

শৈশবে আমার একটা সংসার ছিলো, বাড়ির পশ্চিম কোণে;
নদীর পাড়ে আমগাছের নীচে বাঁশের সাঁকোর কাছেই।
পাটকাঠি আর কলাপাতার ছাউনি ঘেরা সুন্দর একটা সংসার,
একটা বউ আর কয়েকটা ছেলেমেয়েও ছিলো আমার।
আমি ঘরবাড়ি বাঁধতেই ব্যস্ত থাকতাম সারাক্ষণ,
বউয়ের কাজ ছিলো শুধু রান্নাবাড়ি করা আর ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা।
আমি ঘরটা ঠিকঠাক করে বাজার থেকে সদাই পাতি নিয়ে আসতাম,
সদাই-পাতি বলতে বিভিন্ন গাছের ফল আর ইঁদুরের গর্তের মাটি।
বউয়ের রান্নাঘরে মাটির তৈরী চুলা আর মাটিরই হাঁড়ি পাতিল থাকতো,
কাদামাটির পাটাপোতায় হরেকরকম মশলাও বাঁটা হতো।
বউটা পানির সাথে ধুলো মিশিয়ে মজাদার ডাউল রান্না করতো,
তারপর সবাই কলাপাতার ছাউনিতে বসে একসাথে খাবার খেতাম।
জামাই বউয়ের মধুর সংসার তখন কতোইনা সুখের ছিলো,
চাহিদা বলতে একটা ছোট্ট ঘর আর দু'বেলা সাধারণ খাবার।
বউয়ের হাতের রান্নার তারিফ করতে করতে শোবার আয়োজন করতাম,
কলাপাতার ছাউনির নীচেই বিকেল অবধি শান্তির ঘুমে ঘুমাতাম।
অনেকদিন পর বউটা অন্যের ঘরণী হয়ে চলে গেছে,
ছেলে মেয়েরাও সবাই যার যার মত নিজের সংসার গড়েছে।
সংসার মানে কি ছিলো সেদিন?
ওই শৈশবে বেশি কিছু চাহিদা ছিলো না আমাদের।
আজ সংসার বলতে অনেক কিছুরই প্রয়োজন হয় সবার,
সংসার বলতে একটা কলাপাতার ঘর আর কয়েকটা হাঁড়িপাতিল নয়।

সংসার বলতে একটা বাড়ি, কয়েকটা আলাদা আলাদা কামরা;
কয়েকটা বেডরুম কিচেন ড্রইংরুম ডাইনিং রুম ও গেস্টরুম।
সংসার বলতে আমাদের বড় আলমারিটাও,
ড্রইংরুমে সাজানো বইয়ের একটা বড় শেলফ সোফা।
মেয়ের রুমে বড় একটা আয়নাওয়ালা ড্রেসিং টেবিল,
ছেলের রুমে কম্পিউটার আর বিশাল সাউন্ড সিস্টেম।
সবকটা রুমেই টাইলসের উপর চমৎকার বিদেশী কার্পেট,
ডাইনিং টেবিলে অভিজাত ডিনার সেট,পাশে লম্বা মোটাসোটা ফ্রীজ।
মা বাবার রুমটা কিন্তু আকারে অনেক ছোট হয়ে গেছে,
আমাদের প্রতিটা রুমে শীতাতপ নিয়ন্রনের জন্য আধুনিক মেশিন।
বিভিন্ন ডিজাইনের গহনা আর পোশাকও প্রয়োজন হয় নতুন নতুন পার্বনে,
ব্যাংক আর বীমায় কয়েকটা ডিপোজিটও দরকার।
সংসারের সবার হাতেই বিভিন্ন কোম্পানির দামী সেলফোন,
যাতায়াতের জন্য অন্তত মোটর চালিত একটা বাহন।

এতোকিছু ছাড়াই সেদিন ছেলেবেলায় যে সুখ পেয়েছিলাম,
আজ আর সে সুখ খুঁজে কোথাও পাইনা।
আজ আরও আরও অনেক কিছু চাই আমাদের,
আসলে কি চাই?কিসে সুখী হওয়া যায় সেটাই খুঁজি এখনও।
কলাপাতার ছাউনির নীচে অলস বিকেলে রৌদ্রছায়ায় যে সুখ পেয়েছিলাম,
তাকেই খুঁজি এখনও নীরবে নিস্তব্ধতায়।
জানি, আর ফিরে পাবো না সেই সোনাঝরা দিনগুলি;
চাওয়ার দীর্ঘ তালিকার ভারে নুয়ে পড়েছি মাটির বুকে।
হয়তো উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাটুকু হারিয়ে যাবে অচিরেই,
স্থায়ী হবো আবার সেই মাটির ঘরে কলাপাতার ছাউনির নীচেই।

মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ