আজ ৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার

অনেক আকাশ
- জীবনানন্দ দাশ---ধূসর পান্ডুলিপি

গানের সুরের মতো বিকেলের দিকের বাতাসে
পৃথিবীর পথ ছেড়ে – সন্ধ্যার মেঘের রঙ খুঁজে
হৃদয় ভাসিয়া যায়,- সেখানে সে কারে ভালোবাসে !-
পাখির মতন কেঁপে – ডানা মেলে- হিম- চোখ বুজে
অধীর পাতার মতো পৃথিবীর মাঠের সবুজে
উড়ে উড়ে ঘর ছেড়ে কত দিকে গিয়েছে সে ভেসে,-
নীড়ের মতন বুকে একবার তার মুখ গুঁজে
ঘুমাতে চেয়েছে,- তবু- ব্যথা পেয়ে গেছে ফেঁসে,-
তখন ভোরের রোদে আকাশে মেঘের ঠোঁট উঠেছিল হেসে!

আলোর চুমায় এই পৃথিবীর হৃদয়ের জ্বর
ক’মে যায়; -তাই নীল আকাশের স্বাদ- স্বচ্ছলতা-
পূর্ণ ক’রে দিয়ে যায় পৃথিবীর ক্ষুদির গহ্বর;
মানুষের অন্তরের অবসাদ – মৃত্যুর জড়তা 
সমুদ্র ভাঙিয়া যায়; - নক্ষত্রের সাথে কয় কথা
যখন নক্ষত্র তবু আকাশের অন্ধকার রাতে-
তখন হৃদয়ে জাগে নতুন যে এক অধীরতা ,
তাই ল’য়ে সেই উষ্ণ –আকাশের চাই যে জড়াতে
গোধূলির মেঘে মেঘ, নক্ষত্রের মতো র’বো নক্ষত্রের সাথে!

আমারে দিয়েছ তুমি হৃদয়ের যে এক ক্ষমতা
ওগো শক্তি ,- তার বেগে পৃথিবীর পিপাসার ভার
বাধা পায়, জেনে লয় নক্ষত্রের মতো স্বচ্ছতা!
আমারে করেছ তুমি অসহিস্নু- ব্যর্থ-চমৎকার !
জীবনের পারে থেকে যে দেখেছে মৃত্যুর ওপার,
কবর খুলেছে মুখ বার-বার যার ইশারায়,
বীণার তারের মতো পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষার তার
তাহার আঘাত পেয়ে কেঁপে কেঁপে ছিঁড়ে শুধু যায়!
একাকী মেঘের মতো ভেসেছে সে- বৈকালের আলোয় – সন্ধ্যায় !

সে এসে পাখির মতো স্থির হয়ে বাধে নাই নীড়, -
তাহার পাখায় শুধু লেগে আছে তীর – অস্থিরতা !
অধীর অন্তর তারে করিয়াছে অস্থির অধীর !
তাহারি হৃদয় তারে দিয়েছে ব্যাধের মতো  ব্যথা!
একবার তাই নীল আকাশের আলোর গাড়তা  
তাহারে করেছে মুগ্ধ, - অন্ধকার নক্ষত্র আবার 
তাহারে নিয়েছে ডেকে ,- জেনেছে সে এই চঞ্চলতা
জীবনের;- উড়ে উড়ে দেখেছে সে মরণের পার 
এই উদ্বেলতা ল’য়ে নিশীথের সমুদ্রের মতো চমৎকার!

গোধূলির আলো ল’ য়ে দুপুরে সে করিয়াছে খেলা,
স্বপ্ন দিয়ে দুই চোখ একা একা রেখেছে সে ঢাকি ;
আকাশে আঁধার কেটে গিয়েছে যখন ভোরবেলা 
সবাই এসেছে পথে,- আসে নাই তবু সেই পাখি!-
নদীর কিনারে দূরে ডানা মেলে উড়েছে একাকী,
ছায়ার উপরে তার নিজের পাখার ছায়া ফেলে
সাজায়েছে স্বপনের’ পরে তার হৃদয়ের ফাঁকি !
সূর্যের আলোর পরে নক্ষত্রের মতো আলো জ্বেলে
সন্ধ্যার আঁধার দিয়ে দিন তারে ফেলেছে সে মুছে অবহেলা !

কেউ তারে দেখে নাই ;- মানুষের পথ ছেড়ে দূরে
হাড়ের মতন শাখা ছায়ার মতন পাতা ল’য়ে 
যেইখানে পৃথিবীর মানুষের মতো ক্ষুব্ধ হয়ে
কথা কয়,- আকাঙ্ক্ষার আলোড়নে চলিতেছে বয়ে
হেমন্তের নদী,- ঢেউ ক্ষুধিতের মতো এক সুরে
হতাশ প্রাণের মতো অন্ধকারে ফেলিছে নিশ্বাস,-
তাহাদের মতো হয়ে তাহাদের সাথে গেছি রয়ে :
দূরে পড়ে পৃথিবীর ধূলা – মাটি – নদী- মাঠ – ঘাস,-
পৃথিবীর সিন্ধু দূরে ,- আরো দূরে পৃথিবীর মেঘের আকাশ !

এখানে দেখেছি আমি জাগিয়াছ হে তুমি ক্ষমতা,
সুন্দর মুখের চেয়ে তুমি আরো ভীষণ –সুন্দর !
ঝড়ের হাওয়ার চেয়ে আরো শক্তি – আরো ভীষণতা
আমারে দিয়েছে ভয়! এইখানে পাহাড়ের’ পর
তুমি এসে বসিয়াছ,- এইখানে অশান্ত সাগর
তোমারে এনেছে ডেকে ;- হে ক্ষমতা , তোমার বেদনা
পাহাড়ের বনে বনে  তুলিতেছে উত্তরের ঝড়
আকাশের চোখে- মুখে তুলিতেছে বিদ্যুতের ফণা
তোমার স্ফুলিঙ্গ আমি, ওগো শক্তি,- উল্লাসের মতন যন্ত্রণা !

আমার সকল ইচ্ছা প্রার্থনার ভাষার মতন
প্রেমিকের হৃদয়ের গানের মতন কেঁপে উঠে
তোমারে প্রাণের কাছে একদিন পেয়েছে কখন !
সন্ধ্যার আলোর মতো পশ্চিম মেঘের বুকে ফুটে,
আঁধার রাতের মতো তারার আলোর দিকে ছুটে ,
সিন্ধুর ঢেউ এর মতো ঝড়ের হাওয়ার কোলে জেগে
সব আকাঙ্ক্ষার বাঁধ একবার গেছে তার টুটে !
বিদ্যুতের পিছে পিছে ছুটে গেছি বিদ্যুতের বেগে !
নক্ষত্রের মতো আমি আকাশের নক্ষত্রের বুকে গেছি লেগে !

যেই মুহূর্ত চ’লে গেছে ,- জীবনের যেই দিন গুলি
ফুরায়ে গিয়েছে সব,- একবার আসে তারা ফিরে;
তোমার পায়ের চাপে তাদের করেছো তুমি ধূলি !
তোমার আঘাত দিয়ে তাদের গিয়েছ তুমি ছিঁড়ে !
হে ক্ষমতা ,- মনের ব্যথার মতো তাদের শরীরে
নিমেষে নিমেষে তুমি কতবার উঠেছিলে জেগে !
তারা সব চ’লে গেছে;- ভূতুড়ে পাতার মতো ভিড়ে
উত্তর হাওয়ার মতো তুমি আজো রহিয়াছ লেগে!
যে সময় চ’লে গেছে তা- ও কাঁপে ক্ষমতার বিস্ময়ে – আবেগে !

তুমি কাজ ক’রে যাও, ওগো শক্তি , তোমার মতন !
আমারে তোমার হাতে একাকী দিয়েছি আমি ছেড়ে ;
বেদনা- উল্লাসে তাই সমুদ্রের মতো ভরে মন !-
তাই কৌতূহল – তাই ক্ষুধা এসে হৃদয়েরে ঘেরে ,-
জোনাকির পথ ধ’রে তাই আকাশের নক্ষত্রেরে
দেখিতে চেয়েছি আমি, - নিরাশার কোলে ব’সে একা 
চেয়েছি আশারে আমি,- বাঁধনের হাতে হেরে, হেরে 
চাহিয়াছি আকাশের মতো এক অগাধের দেখা ! –
ভোরের মেঘের ঢেউয়ে মুছে দিয়ে রাতের মেঘের কালো রেখা! 

আমি প্রণয়িনী ,- তুম হে অধীর , আমার প্রণয়ী !
আমার সকল প্রেম উঠেছে চোখের জলে ভেসে !-
প্রতিধ্বনির মতো হে ধ্বনি, তোমার কথা কহি
কেঁপে উঠে – হৃদয়ের সে যে কত আবেগে আবেশে!
সব ছেড়ে দিয়ে আমি তোমারে একাকী ভালোবেসে  
তোমার ছায়ার মতো ফিরিয়াছি তোমার পিছনে !
তবু ও হারায়ে গেছ ,- হঠাৎ কখন কাছে এসে
প্রেমিকের মতো তুমি মিশেছ আমার মনে মনে
বিদ্যুৎ জ্বালায়ে গেছ,-আগুন নিভায়ে গেছ হঠাৎ গোপনে !

কেন তুমি আস যাও ? – হে অস্থির , হবে নাকি ধীর !
কোনোদিন !- রৌদ্রের মতন তুমি সাগরের’ পরে
একবার-দুইবার জ্বলে উঠে হতেছ অস্থির  ! –
তারপর, চ’লে যাও কোন দূরে পশ্চিমে- উত্তরে,-
সেখানে মেঘের মুখে চুমু খাও ঘুমের ভুতরে,
ইন্দ্রধনুকের মতো তুমি সেইখানে উঠিতেছ জ্ব’লে,
চাঁদের  আলোর মতো একবার রাত্রির সাগরে 
খেলা করো ;- জ্যোৎস্না চ’লে যায়,- তবু তুমি যাও চ’লে
তার আগে; - যা বলেছ একবার, যাবে নাকি আবার তা ব’লে !

যা পেয়েছি একবার পাব নাকি আবার তা খুঁজে !
যেই রাত্রি যেই দিন একবার কয়ে গেল কথা
আমি চোখ বুজিবার আগে তারা গেল চোখ বুজে,
ক্ষীণ হয়ে নিভে গেল সলিতার আলোর স্পষ্টতা !
ব্যথার বুকের ‘পরে আর এক ব্যথা বিহ্বলতা
নেমে এলো ;- উল্লাস ফুরায়ে গেল নতুন উৎসবে ;
আলো অন্ধকার দিয়ে বুনিতেছি শুধু এই ব্যথা, -
দুলিতেছি এই ব্যথা – উল্লাসের সিন্ধুর বিপ্লবে !
সব শেষ হবে , - তবু আলোড়ন ,- তা কি শেষ হবে !

সকল যেতেছে চ’লে ,- সব যায় নিভে – মুছে- ভেসে-
যে সুর থেমেছে তার স্মৃতি তবু বুকে জেগে রয় !
যে নদী হারায়ে যায় অন্ধকারে –রাতে – নিরুদ্দেশে,
তাহার চঞ্চল জল স্তব্ধ হয়ে কাঁপায় হৃদয় !
যে মুখ মিলায়ে যায় আবার ফিরিতে তারে হয়
গোপনে চোখের’পরে,- ব্যথিতের স্বপ্ন্বের মতন !
ঘুমন্তের এই অশ্রু –কোন পীড়া –সে কোন বিস্ময় 
জানায়ে দিতেছে এসে !- রাত্রি-দিন আমাদের মন
বর্তমান অতীতের গুহা ধ’রে একা একা ফিরিছে এমন ! 

আমরা মেঘের মতো হঠাৎ চাঁদের বুকে এসে
অনেক গভীর রাতে- একবার পৃথিবীর পানে
চেয়ে দেখি, আবার মেঘের মতো চুপে চুপে ভেসে
চ’লে যাই এক ক্ষীণ বাতাসের দুর্বল আহ্বানে 
কোন দিকে পথ বেয়ে! – আমাদের কেউ কি তা জানে ।
ফ্যাকাশে মেঘের মতো চাঁদের আকাশ পিছে রেখে 
চ’লে যাই;- কোন এক রুগ্ন হাত আমাদের টানে ?
পাখির মায়ের মতো আমাদের নিতেছে সে ডেকে 
আরো আকাশের দিকে,- অন্ধকারে,- অন্য কারো আকাশের থেকে !

একদিন বুজিবে কি চারিদিকে রাত্রির গহবর !-
নিবন্ত বাতির বুকে চুপে চুপে যেমন আঁধার  
চ’লে আসে ,- ভালোবেসে – নুয়ে তার চোখের উপর
চুমু খায়,- তারপর তারে কোলে টেনে লয় তার;-
মাথার সকল স্বপ্ন – হৃদয়ের সকল সঞ্চার
একদিন সেই শূন্য সেই শীত নদীর উপরে 
ফুরাবে কি? – দুলে দুলে অন্ধকারে তবুও আবার 
আমার রক্তের ক্ষুধা নদীর ঢেউয়ের মতো স্বরে
গান গাবে,- আকাশ উঠিবে কেঁপে আবার সে সঙ্গীতের ঝড়ে ! 

পৃথিবীর – আকাশের পুরানো কে আত্মার মতন
জেগে আছি; - বাতাসের সাথে সাথে আমি চলি ভেসে,
পাহাড়ে হাওয়ার মতো ফিরিতেছে একা একা মন,
সিন্ধুর ঢেউয়ের মতো দুপুরের সমুদ্রের শেষে 
চলিতেছে ; - কোন এক দূর দেশে – কোন নিরুদ্দেশে
জন্ম তার হয়েছিল ,- সেইখানে উঠেছে সে বেড়ে;
দেহের ছায়ার মতো আমার মনের সাথে মেশে
কোন স্বপ্ন !- এ আকাশ ছেড়ে দিয়ে কোন আকাশেরে
খুঁজে ফিরি !- গুহার হাওয়ার মতো বন্দী হয়ে মন তব ফেরে !

গাছের শাখার জালে এলোমেলো আঁধারের মতো 
হৃদয় খুঁজিছে পথ, ভেসে ভেসে ,- সে যে কারে চায় ।
হিমের হওয়ার হাত তার হাড় করিছে আহত,-
সে- ও কি শাখার মতো – পাতার মতন ঝ’রে যায় !
বনের বুকের গান তার মতো শব্দ ক’রে গায় !
হৃদয়ের সুর তার সে যে কবে ফেলেছে হারায়ে !
অন্তরের আকাঙ্ক্ষারে – স্বপনেরে বিদায় জানায়
জীবন মৃত্যুর মাঝে চোখ বুজে একাকী দাঁড়ায়ে ;
ঢেউয়ের ফেনার মতো ক্লান্ত হয়ে মিশিবে কি সে – ঢেউয়ের গায়ে !  

হয়তো সে মিশে গেছে- তারে খুঁজে পাবে নাকো কেউ!
কেন যে সে এসেছিল পৃথিবীর কেহ কি তা জানে !
শীতের নদীর বুকে অস্থির হয়েছে যেই ঢেউ  
শুনেছে সে উষ্ণ গান সমুদ্রের জলের আহ্বানে !
বিদ্যুতের মতো অল্প আয়ু তবু ছিল তার প্রাণে , 
যে ঝড় ফুরায়ে যায় তাহার মতন বেগ লয়ে
যে প্রেম হয়েছে ক্ষুব্ধ সেই ব্যর্থ প্রেমিকের গানে
মিলায়েছে গান তার ,- তারপরে চ’লে গেছে বয়ে।
সন্ধ্যার মেঘের রঙ কখন গিয়েছে তার অন্ধকার হয়ে ! 

তবুও নক্ষত্র এক জেগে আছে,- সে যে তারে ডাকে!
পৃথিবী চায় নি যারে,- মানুষ করেছে যারে ভয়
অনেক গভীর রাতে তারায় তারায় মুখ ঢাকে 
তবুও সে ! – কোন এক নক্ষত্রের চোখের বিস্ময়
তাহার মানুষ চোখে ছবি দেখে একা জেগে রয় !
মানুষীর মতো ? কিংবা আকাশের তারাটির মতো ,-
সেই দূর- প্রণয়িনী আমাদের পৃথিবীর নয় !
তার দৃষ্টি তাড়নায় করেছে যে আমারে ব্যাহত ,-
ঘুমন্ত বাঘের বুকে বিষের বাণের মতো বিষম সে ক্ষত !

আলো আর অন্ধকারে তার ব্যথা- বিহবলতা লেগে,
তাহার রক্তে পৃথিবী হতেছে শুধু লাল !-
মেঘের চিলের মতো – দুরন্ত চিতার মতো বেগে
ছুটে যাই ;- পিছে ছুটে আসিতেছে বৈকাল-সকাল
পৃথিবীর ;- যেন কোন মায়াবীর নষ্ট ইন্দ্রজাল
কাঁদিতেছে ছিঁড়ে গিয়ে ! কেঁপে কেঁপে পড়িতেছে ঝ’রে!
আরো কাছে আসিয়াছি তবু আজ, - আরো কাছে কাল
আসিব তবুও আমি,- দিন রাত্রি রয় পিছে প’ড়ে ,-
তারপর একদিন কুয়াশার মতো সব বাধা যাবে স’রে !

সিন্ধুর ঢেউয়ের তলে অন্ধকার রাতের মতন
হৃদয় উঠিতে আছে কোলাহলে কেঁপে বার-বার!
কোথায় রয়েছে আলো জেনেছে তা – বুঝেছে তা মন
চারিদিকে ঘিরে তারে রহিয়াছে যদিও আঁধার !
একদিন এই গুহা ব্যথা পেয়ে আহত হিয়ার
বাঁধন খুলিয়া দেবে ! অধীর ঢেউয়ের মতো ছুটে  
সেদিন সে খুঁজে লবে ওই দূর নক্ষত্রের পার !
সমুদ্রের অন্ধকারে গহ্বরের ঘুম থেকে উঠে 
দেখিবে জীবন তার খুলে গেছে পাখির ডিমের মতো ফুটে !

মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ