আজ ৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, সোমবার

অধঃপতন সঙ্গীত
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়---গদ্য পদ্য ও কবিতাপুস্তক


বাগানে যাবি রে ভাই?      চল সবে মিলে যাই,
যথা হর্ম্ম্য সুশোভন,  সরোবরতীরে।
যথা ফুটে পাঁতি পাঁতি,      গোলাব মল্লিকা জাতি,
বিগ্নোনিয়া লতা দোলে মৃদুল সমীরে ||
নারিকেল বৃক্ষরাজি,         চাঁদের কিরণে সাজি,
নাচিছে দোলায় মাথা ঠমকে ঠমকে।
চন্দ্রকরলেখা তাহে, বিজলি চমকে ||


চল যথা কুঞ্জবনে,         নাচিবে নাগরী গণে,
রাঙ্গা সাজ পেসোয়াজ, পরশিবে অঙ্গে।
তম্বুরা তবলা চাটি,       আবেশে কাঁপিবে মাটি,
সারঙ্গ তরঙ্গ তুলি, সুর দিবে সঙ্গে ||
খিনি খিনি খিনি খিনি,
ঝিনিক ঝিনিক ঝিনি
তাধ্রিম্ তাধ্রিম্ তেরে গাও না বাজনা!
চমকে চাহনি চারু, ঝলকে গহনা ||


ঘরে আছে পদ্মমুখী          কভু না করিল সুখী,
শুধু ভাল বাসা নিয়ে, কি হবে সংসারে।
নাহি জানে নৃত্যগীত,         ইয়ার্‌কিতে নাহি চিত,
একা বসি ভাল বাসা ভাল লাগে কারে?
গৃহকর্ম্মে রাখে মন,            হিত ভাবে অনুক্ষণ,
সে বিনা দুঃখের দিনে অন্য গতি নাই!
এ হেন সুখের দিনে, তারে নাহি চাই ||


আছে ধন গৃহপূর্ণ,                যৌবন যাইবে তূর্ণ,
যদি না ভুঞ্জিনু সুখ, কি কাজ জীবনে?
ঠুসে মদ্য লও সাতে,            যেন না ফুরায় রাতে,
সুখের নিশান গাঢ় প্রমোদভবনে।
খাদ্য লও বাছা বাছা,           দাড়ি দেখে লও চাচা,
চপ্ সুপ কারি কোর্ম্মা, করিবে বিচিত্র।
বাঙ্গালির দেহ রত্ন,                ইহাতে করিও যত্ন,
সহস্র পাদুকা স্পর্শে, হয়েছে পবিত্র।
পেটে খায়, পিঠে সয়, আমার চরিত্র ||


বন্দে মাতা সুরধুনি,             কাগজে মহিমা শুনি,
বোতলবাহিনি পুণ্যে একশ নন্দিনি!
করি ঢক ঢক নাদ,               পূরাও ভকতসাধ,
লোহিত বরণি বামা,    তারেতে বন্দিনি!
প্রণমামি মহানীরে,               ছিপির কিরীটি শিরে,
উঠ শিরে ধীরে ধীরে যকৃৎজননি!
তোমার কৃপার জন্য,            যেই পড়ে সেই ধন্য
শয্যায় পতিত রাখ, পতিতপাবনি!
বাক্‌স বাহনে চল, ডজন ডজনি ||


কি ছার সংসারে আছি,          বিষয় অরণ্যে মাছি,
মিছা করি ভন্‌ভন্ চাকরি কাঁটালে।
মারে জুতা সই সুখে,             লম্বা কথা বলি মুখে,
উচ্চ করি ঘুষ তুলি দেখিলে কাঙ্গালে ||
শিখিয়াছি লেখা পড়া,          ঠাণ্ডা দেখে হই কড়া,
কথা কই চড়া চড়া, ভিখারি ফকিরে।
দেখ ভাই রোখ কত, বাঙ্গালি শরীরে!


পূর পাত্র মদ্য ঢালি,                  দাও সবে করতালি,
কেন তুমি দাও গালি, কি দোষ আমার?
দেশের মঙ্গল চাও?                 কিসে তার ত্রুটি পাও?
লেক্‌চারে কাগজে বলি, কর দেশোদ্ধার ||
ইংরেজের নিন্দা করি,            আইনের দোষ ধরি,
সম্বাদ পত্রিকা পড়ি, লিখি কভু তায়।
আর কি করিব বল স্বদেশের দায়?


করেছি ডিউটির কাজ,       বাজা ভাই পাখোয়াজ,
কামিনি, গোলাপি  সাজ, ভাসি আজ রঙ্গে।
গেলাস পূরে দে মদে, দে দে দে আরো আরো দে,
দে দে এরে দে ওরে দে, ছড়ি দে সারঙ্গে।
কোথায় ফুলের মালা,আইস্ দে না? ভাল জ্বালা,
“বংশী বাজায় চিকণ কালা?” সুর দাও সঙ্গে।
ইন্দ্র স্বর্গে খায় সুধা,           স্বর্গ ছাড়া কি বসুধা?
কত স্বর্গ বাঙ্গালায় মদের তরঙ্গে।
টলমল বসুন্ধরা ভবানী ভ্রূভঙ্গে ||


যে ভাবে দেহের হিত,        না বুঝি তাহার চিত,
আত্মহিত ছেড়ে কেবা, পরহিতে চলে?
না জানি দেশ বা কার?    দেশে কার উপকার?
আমার কি লাভ বল,  দেশ ভাল হলে?
আপনার হিত করি,          এত শক্তি নাহি ধরি,
দেশহিত করিব কি, একা ক্ষুদ্র প্রাণী।
ঢাল মদ! তামাক দে! লাও ব্রাণ্ডি পানি ||

১০

মনুষ্যত্ব? কাকে বলে?         স্পিচ দিই টোনহলে,
লোকে আসে দলে দলে, শুনে পায় প্রীত।
নাটক নবেল কত,             লিখিয়াছে শত শত,
এ কি নয় মনুষ্যত্ব? নয় দেশহিত?
ইংরেজি বাঙ্গালা ফেঁদে,  পলিটিক্‌‌স লিখি কেঁদে,
পদ্য লিখি নানা ছাঁদে,  বেচি সস্তা দরে।
অশিষ্টে অথবা শিষ্টে,            গালি দিই অষ্টে পৃষ্ঠে,
তবু বল দেশহিত কিছু নাহি করে?
নিপাত যাউক দেশ! দেখি বসে ঘরে ||

১১

হাঁ! চামেলি ফুলিচম্পা!         মধুর অধর কম্পা!
হাম্বীর কেদার ছায়ানট সুমধুর‌!
হুক্কা না দুরস্ত বোলে?  শের মে ফুল না ডোলে!
পিয়ালা ভর দে মুঝে! রঙ্ ভরপুর!
সুপ্ চপ কটলেট,               আন বাবা প্লেট প্লেট,
কুক্ বেটা ফাষ্টরেট,  যত পার খাও!
মাথামুণ্ড পেটে দিয়ে,           পড় বাপু জমি নিয়ে,
জনমি বাঙ্গালিকুলে, সুখ কর্যেও যাও।
পতিতপাবনি সুরে, পতিতে তরাও ||

১২

যাব ভাই অধঃপাতে,        কে যাইবি আয় সাতে,
কি কাজ বাঙ্গালি নাম,  রেখে ভূমণ্ডলে?
লেখাপড়া ভস্ম ছাই,         কে কবে শিখিছে ভাই
লইয়া বাঙ্গালি দেহ, এই বঙ্গস্থলে?
হংসপুচ্ছ লয়ে করে,         কেরাণির কাজ করে,
মুন্সেফ চাপরাশি আর ডিপুটী পিয়াদা।
অথবা স্বাধীন হয়ে,           ওকালতি পাশ লয়ে,
খোশামুদি জুয়াচুরি, শিখিছে জিয়াদা!
সার কথা বলি ভাই,         বাঙ্গালিতে কাজ নাই,
কি কাজ সাধিব মোরা, এ সংসারে থাকি,
মনোবৃত্তি আছে যাহা,          ইন্দ্রিয় সাগরে তাহা
বিসর্জ্জন করিয়াছি, কিবা আছে বাকি?
কেহ দেহভার বয়ে, যমে দাও ফাঁকি?

১৩

ধর তবে গ্লাস আঁটি,            জ্বলন্ত বিষের বাটি
শুন তবলার চাঁটি, বাজে খন্ খন্।
নাচে বিবি নানা ছন্দ,           সুন্দর খামিরা গন্ধ,
গম্ভীর জীমূতমন্দ্র হুঁকার গর্জ্জন ||
সেজে এসো সবে ভাই,          চল অধঃপাতে যাই,
অধম বাঙ্গালি হতে, হবে কোন কাজ?
ধরিতে মনুষ্যদেহ, নাহি করে লাজ?

১৪

মর্কটের অবতার,                   রূপগুণ সব তার
বাঙ্গালির অধিকার, বাঙ্গালি ভূষণ!
হা ধরণি, কোন্ পাপে,            কোন্ বিধাতার শাপে
হেন পুত্রগণ গর্ব্ভে, করিলে ধারণ?
বঙ্গদেশ ডুবাবারে,              মেঘে কিম্বা পারাবারে,
ছিল না কি জলরাশি? কে শোষিল নীরে?
আপনা ধ্বংসিতে রাগে         কতই শকতি লাগে?
নাহি কি শকতি তত বাঙ্গালি শরীরে?
কেন আর জ্বলে আলো বঙ্গের মন্দিরে?

১৫

মরিবে না? এসো তবে,        উন্নতি সাধিয়া সবে,
লভি নাম পৃথিবীতে, পিতৃ সমতুল!
ছাড়ি দেহ খেলা ধূলা,         ভাঙ বাদ্যভাণ্ডগুলা
মারি খেদাইয়া দাও, নর্ত্তকীর কুল।
মারিয়া লাঠির বাড়ি,         বোতল ভাঙ্গহ পাড়ি,
বাগান ভাঙ্গিয়া ফেল পুকুরের তলে।
সুখ নামে দিয়ে ছাই,         দুঃখ সার কর ভাই,
কভু না মুছিবে কেহ, নয়নের জলে,
যত দিন বাঙ্গালিকে লোকে ছি ছি বলে ||

মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ