অনুভুতির চোখ ( একাকী নিঃসঙ্গ মানুষগুলো )
- রুবিনা মজুমদার
প্রতিটা মানুষের দু’টো চোখ আছে ,এই সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখার জন্য । সেই দুটো চোখ দিয়ে মানুষ এই পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করেন । ঠিক তেমনি ভাবে মানুষের হৃদয়ের ও চোখ আছে , প্রতিটি মানুষ চোখ দিয়ে দেখেন আর হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন । জীবনের সুখ – দুঃখ , হাসি – কান্না , আনন্দ – বেদনা । কিন্তু মানুষ চোখ দিয়ে যা কিছু দেখেন , হৃদয় দিয়ে কি সেই সব কিছু অনুভব করতে পারেন _ ?? মানুষের চোখ দিয়ে দেখা সব দৃশ্য হয়তো হৃদয়ের অনুভূতিতে আসে না ।
————-ঃ শুধু এটাই হয়তো পার্থক্য ঃ ———
একাকী মানুষ মানে —- যার কোনো সঙ্গী সাথী নেই ।
মানুষের বয়স যখন ৬০ / ৬৫ পর্যন্ত গড়ায় তখন থেকেই মানুষ একাকী হতে শুরু করেন । কিন্তু তার আগেও কেউ কেউ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন । ২৫/ ৩০ বছর সংসার করার পর , কারো স্বামী মারা যায় , কারো স্ত্রী মারা যায় , কেউ কেউ হয়তো কোনো দুর্ঘটনার কারণে পঙ্গু জীবন – যাপন করেন । কেউ কেউ চাকরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন । নিয়তির নিয়মের প্রতিকূলে এসে মানুষগুলো ভীষণভাবে একাকী নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন । তখন বোধকরি আমরা কেউ তাদের কথা ভাবি না । অনেক সময় এই একাকী নিঃসঙ্গ মানুষটি সংসারের বোঝা হয়ে দাঁড়ায় ।
যে মানব বা মানবী একটা সংসার কে নিজ সন্তানদেরকে ২৫/ ৩০ বছর ধরে আগলে রেখেছেন — সেই মানুষটাই এক সময় একাকী নিঃসঙ্গ জীবন – যাপন করেন । আধুনিক যুগে অনেক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে সন্তানদের – পিতা – মাতার প্রতি অবহেলার কারণে — ।
একটা নিদিষ্ট সময়ে এসে একজন পুরুষ বা নারী যখন চাকরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন , তখন তিনি বেশী একাকীত্বতে ভোগেন । কারণ নিয়ম মাফিক অফিসে আসা – যাওয়া , সহকর্মীদের সাথে কুশল বিনিময় – এইসব আর হয়ে উঠে না । একটা বাড়ীর মধ্যে থেকেও একই পরিবারের মধ্যে থেকেও একটা বাড়ীর একাকী একটা রুমের মধ্যে তার জীবন সীমাবদ্ধ থাকে ।
নিঃসঙ্গ মানুষটি একাকী জীবন -যাপনের ফলে আস্তে আস্তে মানুষটি চিন্তা গ্রস্থ হতে থাকে , তার মনে বিভিন্ন রকমের অসহায়ত্ব বোধ জেগে উঠে , যার ফলে দিনে দিনে সেই মানুষটি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে থাকে । একাকী নিঃসঙ্গ মানুষটি তার চারপাশের মানুষগুলোর কাছে নিজেকে বোঝা বলেই মনে করেন । তাদের নিজের ছেলে – মেয়েরা নিজেদের ঘর – সংসার নিয়ে , নিজেদের কর্মময় জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । একাকী নিঃসঙ্গ মানুষটিকে কেউ সময় দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না । তখন একাকী নিঃসঙ্গ মানুষটির মনের ভিতর বিভিন্ন রকমের ঝড় বয়ে চলে , মনের সেই কষ্টের কথা একাকী মানুষটা কাউকে বলেন না । বুকের ভিতর ছাই চাপা আগুন নিয়ে হয়তো নীরবে চোখের জল ফেলেন । আর চারপাশটায় নির্বাক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন । সেই একাকী মানুষটার সেবা – যত্নের জন্য , সহানুভূতি প্রকাশ করার জন্য , তারইও হয়তো একটি সঙ্গির প্রয়োজন হয় । কিন্তু এই সংসার এই সমাজ কখনো তা ভাবে না , চিন্তাও করে না ।প্রয়োজন মনে করে না অথবা মেনেও নিতে পারে না ।
দেখা যায় একাকী মানুষটা অসুস্থ হলে ছেলে – মেয়ে , আত্মীয় – স্বজন সবাই তাকে দেখতে আসে , কান্না – কাটি করে , কিছুক্ষণের জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করে । আবার সবাই সবার কর্মক্ষেত্রে চলে যায় । কোনো ছেলে বা মেয়ের সংসারে একাকী মানুষটা কিন্তু একাই রয়ে যায় ।
একজন বৃদ্ধ মানব – মানবী পরিবারের একজন সদস্য । তার চাওয়া – পাওয়া থাকতে পারে , অভিযোগ বা মতামত প্রকাশের অধিকার আছে । কিন্তু পরিবার সে একাকী মানব – মানবীকে সেই ভাবে মূল্যায়ন করেন না । তাদের বয়স হয়েছে তারা মারা যাবেন , এই চিন্তা ধারার মধ্যে পরিবার আবদ্ধ থাকেন ।
কিন্তু এই একাকী নিঃসঙ্গ মানুষগুলো যতোদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকেন — তাদের কিভাবে ভালো রাখা যায় ? কিভাবে সুস্থ রাখা যায় ? সেই চিন্তাগুলো কি আধো পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা করেন ?
এটাই বাস্তবতা ঃ————
আর এই বাস্তবতা বড়ই কঠিন আর নির্মম । তাইতো সেই একাকী নিঃসঙ্গ মানুষটি অস্ত যাওয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে শুধুই দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন আর মৃত্যুর প্রহর গুনেন । আর চোখের নোনাজলে নীরব কান্নার ধ্বনি বুকে বাজে ।
মানবিক/সামাজিক
।
০৬-০৬-২০২৩
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।