অপুর্নতার আঁধারে
- বিচিত্র বিশ্বাস নীল
প্রিয় প্রিয়াসা,
কি হলো অবাক হচ্ছো? এই যুগে চিঠি, তার উপর
প্রেরকের নাম নেই এতে অবাক হবারই
কথা। তবে পত্রটা পড়লে আমাকে
চিনতে হয়ত কষ্ট হবেনা তোমার।
.
অনেক ইচ্ছে তোমাকে একটা গান
শোনানোর জানো? গানটার নাম
"এভাবে চাই ", আমার প্রিয় অনেক সুন্দর
একটা গান।কিন্তু তোমাকে
শোনানোর ইচ্ছেটা শুধু ইচ্ছেই রয়ে
গেল গো! সেটা পূরণ করতে পারলাম
না।
.
আচ্ছা মানুষ জীবনে প্রথমবার
কলেজে গিয়ে কি দেখে?
নিশ্চই কলেজের চেহারা দেখে,
আমার বেলা সেটা হয়নি। গেট
পেরিয়ে আমি প্রথম তোমার চাঁদমুখটা
দেখেছিলাম। তুমি হেসে হেসে কথা
বলছিলে, গালে টোল পড়েছিল
তোমার। অবাধ্য চুলগুলো ক্ষনে ক্ষনে
ঠিক করেছিলে তুমি, কাজল দেয়া
তোমার দুচোঁখ দেখে থমকে
দাড়িয়েছিলাম আমি। তুমি এসব
খেয়ালই করনি।
.
সেদিনের কথা খেয়াল আছে
তোমার?? দিনটা ছিল মঙ্গলবার, আর
আমার জন্য মঙ্গলকর একটা দিন। সেদিন
আমি তোমাকে দেখতে দেখতে একটা
গাছের সাথে ধাক্কা খেয়েছিলাম!!
তারপর মাটিতে পড়ে গেছিলাম!
সবাই হেসেছিল, কিন্তু আমি তবু
তোমার দিকে তাকিয়েছিলাম। তুমি
সেদিন হাসোনি, কিছুটা অস্বস্তি
বোধ করেছিলে। কারণ সেদিনই তুমি
দেখেছ আমি তোমায় হা করে দেখি।
.
এরপর অই দিন! প্রথম তোমার চোঁখে
আমার চোখ পড়েছিল, লজ্জায় তুমি
চোঁখ নামিয়ে নিয়েছিলে।আমি একটু
ভয় পেয়েছিলাম, তখনই আমার মনে
বেজে উঠেছিল প্রিয় গানের লাইনটা-
"এ চোঁখে রেখেছিলে মায়া চোঁখ,
থমকে গেছে সময় অকারন
ফেরা গেল না কিছুতেই, বেলা
শেষে অভিমানি মন..।"
.
সত্যি বলছি, সেদিনের পর থেকে
তোমার প্রতি আমার প্রেমটা
চক্রবৃদ্ধিহারে বেড়ে গেছিল।
.
এতদিন তো শুধু আমিই তোমাকে
দেখতাম, সেদিনের পর থেকে তুমিও!!!
কি সৌভাগ্য আমার! তুমি যখন আমার
দিকে আড়চোখে তাকাতে তখন
হার্টবিট বেড়ে যেত আমার, এভাবে
কেন তাকাতে বল তো? বুকটা ছিড়ে
যেত আমার তোমার চাহনী দেখে। আর
একদিনের ঘটনা বলি, দুজনের চোঁখে
চোঁখ পড়ার পর তুমি মুচকি হাসি
দিয়েছিলে! জানো সেদিন এতটাই
উত্তেজিত ছিলাম যে বাসায় এসে
আমার জ্বর হয়েছিল! কখনো শুনেছো?
প্রিয় মানুষের হাসি দেখে জ্বর
এসেছে কারো? আমার সেদিন জ্বর
এসেছিল, কারন তোমার হাসি টা শুধু
হাসিই ছিলনা, এতে অনেকটা
ভালবাসা মাখানো ছিল যে!
.
যেদিন প্রথম কথা বলেছিলাম, মনে
আছে তোমার? সেদিন খুব সুন্দর
লাগছিল তোমায়।
সরি, এই দেখো কান ধরছি আমি।
তোমাকে তো
সবসময় সুন্দর লাগত, সেদিন একটু বেশীই
লেগেছিল! কারণ সেদিন তোমায় প্রথম
শাড়িতে দেখেছিলাম, নীল রংঙের
শাড়ি ছিল! আর অদ্ভুতভাবে আমিও
সেদিন নীল শার্ট পড়ে কলেজে গিয়েছিলাম।তোমার
বান্ধবী একটা কথা বলেছিল তোমায়,
সেটা আমার আজো মনে পড়ে। ও
বলেছিল, "ওই তোর নীল তো
তোর দিকেই আসছে!"
আমিতো খুব লাজুক তাই
সেদিনও তোমায় বলতে পারিনি মুখ
ফুটে মনের কথাটা।
আচ্ছা সেদিন তোমাকে কি যেন
জিজ্ঞেস করেছিলাম??
ও হ্যা সেদিন
প্রথম তোমার নামটা জানতে
চেয়েছিলাম আমি। তুমি ছোট্ট করে
উত্তর দিয়েছিলে, "প্রিয়াসা"। নামটা
কিউট অনেক, সেদিন বলতে পারিনি।
তবে ফিরে আসার সময় শুনেছিলাম তুমি
জিজ্ঞেস করেছিলে-
"এই যে মিষ্টার কিছু বলবেন না?"
আমি তোতলাতে
তোতলাতে বলেছিলাম- "নননননাহ..।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তোমার
বান্ধবী হেসেই খুন, ইচ্ছে হচ্ছিল ওর চুল
ধরে গাছটায় একটা ঠোকর দেই। সেদিন
তোমার মুখ একবার দেখেই আর দেখার
সাহস হয়নি আমার জানো? কেন বলতো?
কারণ আমি না বলার পর তুমি রেগে
গিয়েছিলে, হয়ত ভেবেছ আমি
তোমাকে প্রোপজ করব, কিন্তু করিনি।
আমি ভিতুর ডিম তো তাই।
যখন চলে যাচ্ছি, তুমি কাঁদো কাঁদো
হয়ে বলেছিলে-
"বোকা একটা, কিচ্ছু
বলতে পারেনা। ইচ্ছে করে শার্ট এর
কলার ধরে ঠাটিয়ে চড় দেই।"
ভেবেছিলে শুনেনি।
কিন্তু সেদিন সবই
শুনেছি আমি। কিন্তু কি করি বলো?
আমি তো ভিতু ছেলে, প্রেম
ভালবাসা এসব আমার দাড়া হয়না যে!
এই দেখোনা, কতদিন পর চিঠি দিলাম
তোমায়, সেই কথা বলেছি তার কত বছর
পর।
.
আচ্ছা আমায় কি এখনো তোমার মনে
পড়ে?? কত স্বপ্ন ছিল আমার তোমায়
নিয়ে জানো? লাল টুকটুকে একটা শাড়ি
পড়ে তুমি আমার ঘরে আসবে বউ হয়ে।
এক বুক ভালবাসা দিয়ে ভরিয়ে রাখব
তোমায়। যেদিন আমাদের বাসর রাত
হবে। দুজনে মিলে জোৎস্না স্নানে
কাটিয়ে দেব পুরো রাত, হাতে
থাকবে হাত। যে হাত কখনোই ছাড়ব না
আমি। ভোরে গোসল শেষে ভেজা
চুলে দাঁড়িয়ে থাকবে তুমি। আমি
লেপের নিচ থেকে চুপি চুপি তোমায়
দেখব।
কিন্তু দেখো? এতটা ভিতু কেন
আমি? এই জন্যই আজো মুখ ফুটে বলতে
পারলাম না তোমায় ভালবাসি।
আচ্ছা তুমি কি আমাকে ভালবাসতে?
কি জানি হয়ত না। নাহলে সেদিন
আমায় ফিরিয়ে দিয়েছিলে কেন?
ওইযে, যেদিন সবারই বিদায় হল
কলেজ থেকে। আমার মনে ভয় ছিল
তোমাকে হয়তো আর পাবনা কখনো।তাই
সেদিন বলেছিলাম মনের কথাটা
তোমায়। কিন্তু তুমি আমায় না করে
দিলে!!
.
অবশ্য দেবারই কথা, দীর্ঘ চার
বছর পর কেউ প্রপোজ করলে হয়ত তাকে
ফিরিয়ে দেয়াই উত্তর মনে হয়েছে
তোমার। আমি কিন্তু জানি তুমি আমায়
মনে থেকে সেদিন উত্তরটা দাওনি।
কারণ তোমার চোঁখের ভাষার সাথে
সেদিন তোমার মুখের কথা মেলেনি,
তবু তোমাকে কিচ্ছু বলিনি আমি।
চুপচাপ চলে গেছিলাম সেখান থেকে,
এক মুহুর্তও দেরী করিনি।আমি অনেক সময়
ভাবি যে সেদিন আমার এত সাহস
এসেছিল কোথা থেকে?? এত বড় ভিতু
ছেলেটা তোমায় প্রপোজ করেছে!!
যদিও উত্তরটা মন মত ছিলনা আমার। যাক
সেসব কথা। আমাকে ছেড়ে যদি ভাল
থাকো তবে সেটাই হোক, তাই তো
সেদিনের পর থেকে আর কখনো
তোমার সামনে আসিনি।
.
আচ্ছা তুমি কি সিগারেট পছন্দ করো?
নিশ্চয় না, কারণ ভাল মেয়েরা এসব
পছন্দ করেনা। কিন্তু সত্যি বলতে কি
জানো? সেদিন তোমার কাছ থেকে
রিজেক্টেড হওয়ার পর থেকে
সিগারেট আমার সঙ্গি হয়ে যায়। ভিতু
ছেলেটা আস্তে আস্তে নেশার জগতে
জড়িয়ে যায়, শুধুমাত্র প্রিয়াসা নামের
কিউট মেয়েটাকে ভোলার জন্য। কিন্তু
দেখো, আমি কিন্তু তোমায় ভুলতে
পারিনি। কত চেষ্টা করেছি ভুলে
থাকার, পারিনি গো। ঠিক আমার
প্রিয় গানের লাইনের মতই গো।
.
"তবুও যাওনি ফুরিয়ে তুমি, আজো চেনা
লাগে যেন সবই
স্মৃতির দুয়ার খুলে দেখি, বহু পুরনো সেই
তুমি।"
.
তুমি যখন এই চিঠিটা পড়ছ, তখন হয়ত আমি
আর নেই এ জগতে। অতিরিক্ত পরিমানে
নেশা করতাম সবসময়।তারই ফলশ্রুতিতে
আজ আমি মরণ রোগে আক্রান্ত। তোমার
বান্ধবী অনুর সাথে দেখা
হয়েছিলো একদিন।ওকে চিঠিটা দিয়ে
দিয়েছি। আমি জানি তুমি এখনো
আমার উপর রেগে আছো।আমি ভিতু
বলে। কিন্তু তুমি কি পারতে না
সেদিন আমায় বলতে যে-
নীল তোমায়
আমিও ভালবাসি।
কিন্তু তুমি বলোনি।
আর
তাইতো আমি এখন মরণের কাছাকাছি।
ভাল থেকো তুমি।
আজকে আর কিছুই বলার নেই আমার।
.
ইতি
তোমার বোকা ছেলে নীল।
.......................
চিঠিটা পড়ে আবারও আজকে কাদঁছে
প্রিয়াসা। প্রতি বছর এই দিনে
চিঠিটা বের করে পড়ে সে।আর
কাঁদে সেই ভিতু ছেলেটার জন্য। তার সেই
রেগে গিয়ে ছেলেটাকে না করে
দেয়াই যে কাল হয়ে দাঁড়ায়।
সেদিনের পর থেকে আর দেখেনি
ছেলেটাকে।অনেক খুঁজেও পায়নি।
কয়েক বছর আগের কথা।তার বান্ধবী
অনু এসে চিঠিটা দিয়ে যায়
তাকে। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে
গেছে, কারণ তার প্রিয় বোকা ছেলেটা তখন
আর এই পৃথিবীতে নেই.....।
.
পাশের ঘরে তার ফোনটার রিংটোন
বেজে উঠলো।কারো কল এসেছে হয়ত।
"তোমাকে শত সহস্র বছর পেড়িয়ে
এভাবে চাই।
তুমি রয়ে গেছো আমার সময় ছুঁয়ে সবটাই।"
.
উৎস্বর্গঃ আমার গল্পের নায়িকা।
০৬-০৬-২০২৩
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।