কামাল
- জিহাদ আমিন
বাস্তব এবং কাল্পনিক চিন্তাধারা থেকে নেওয়া
এমন একটি চরিত্রের উপর ভিত্তি করে লেখা-
ছোট গল্প...
কামাল
-জিহাদ আমিন
কামাল বড় ভালো ছেলে
গ্রামের অন্য আর আট দশটা ছেলের মত নয়,
স্কুল থেকে আসার পর অন্যান্য সহপাঠীরা যখন খেলায় মেতে থাকতো অন্যদিকে কামাল সংসারের কাজে বাবা মায়ের সাথে হাত লাগাতো,নামাজের সময় হলে আযান দিতে দেরি কামাল সবার আগে মসজিদে পৌছে যেত,নামাজ শেষেও পাড়ার বন্ধদের সাথে কোন আড্ড নয় সোজা বাড়ি ফিরত।
কামালের বাবা জলিল মিয়া দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষ,এক কথায় ওদের অভাবের সংসার
ছয় সাত জনের পরিবারে জলিল মিয়াই একমাত্র উপার্জন করার মত।
কোনদিন কাজ পেত আবার কোন কোন দিন এমনও হত কোন কাজই মিলতোনা,সারাদিন অপেক্ষার প্রহর গুনে সন্ধায় নিরাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হত।
কামালের মা ওর বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারতো আজ কোন কাজ মিলেনি তাই আগ বাড়িয়ে বলতো ওগো কামালের বাপ তুমি এমনি মন খারাপ করোনা, আজ কাজ মেলেনি তো কি হইছে কালকে অবিশ্যই মিলবে ইনশাআল্লাহ আল্লাহর উপর ভরসা রাখ।
আল্লাহর দয়ায় আমরা অনেক ভালো আছি,
অনেকে তো দেখ না খেয়েও ওদের দিন পার করে,আমরা তো কয়ডা খাইতে পাড়ি এইটাই আল্লাহর দরবারে বড় শুকরিয়া।
কামালের মা রহিমা খাতুন অনেক শান্ত প্রকৃতির মানুষ,সংসারে কিছু থাকুক আর না থাকুক কখনো স্বামীর সাথে এই নিয়ে দুই কথা হতোনা তার এবং কি মুখ বেজার করে কোন সময় কিছুই সে বলতোনা,উল্টো স্বামীকে শান্তনা দিত,
এভাবে কেটে যেতে লাগলো অভাব অনটনের মাঝেও তাদের সুখের সংসার।
ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস,প্রতিদিনের মত আজও কাজ শেষে বাড়ি ফিরলো জলিল মিয়া,
বাড়িতে প্রবেশ করতেই... রহিমা খাতুন রহিমা খাতুন....দুই তিন বার ডাক দিয়ে হাতে একটা বড় মাছ মুখে মৃদু হাসি,রহিমা খাতুন তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হয়ে আসলো আর বলতে লাগলো কি হইছে কামালের বাপ তোমার আজ এত ডাকাডাকি কেন,
উত্তরে জলিল মিয়া.. আর বলোনা আজকে একটু কাজ বেশি করেছিলাম বলে মহাজন খুশি হয়ে সবাইকে একশত টাকা করে বেশি দিয়েছেন,
আসার সময় সামনে বাজার পড়লো তাই ভাবলাম অনেকদিন ধরেতো তোমাদেরকে ভালো কিছু খাওয়াতে পারিনা তাই এই মাছটা নিয়ে আসলাম,
কামালের মা মাছ হাতে নিয়ে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল তার পর কেঁটে পরিস্কার করে ভালো করে রান্না করলো।
রাতে পরিবারের সবাই মিলে এক সাথে খেতে বসলো,জলিল মিয়া খেতে খেতে বলতে লাগলো প্রতিদিন যদি তোমাদেরকে এভাবে খাওয়াতে পারতাম...
উত্তরে রহিমা খাতুন...এভাবে বলোনা আল্লাহ আমাদেরকে যেভাবে রেখেছেন আমরা তাতেই খুশি।
খাওয়া দাওয়া সেরে সবাই শুয়ে পড়লো,মধ্যেরাতে হঠাৎ জলিল মিয়ার বুক ব্যাথা শুরু হল, ধীরে ধীরে ব্যাথা আরো বেড়ে যেতে লাগলো,প্রচন্ড ব্যাথায় চিৎকারে রহিমা খাতুনের ঘুম ভেঙ্গে গেল বলতে লাগলো কি হইছে কামালের বাপ তুমি এমন করছো কেন?
আর ডাকতে শুরু করলো কামাল বাবা আমার তাড়াতাড়ি ওঠ দেখ তোর বাবা যেন কেমন করছে,জলিল মিয়ার এমন অবস্থা দেখে সবাই কান্না শুরু করলো,আস্তে আস্ত পুরো শরীর নিস্তেজ হতে লাগলো কিছুক্ষণ পরেই সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে চিরদিনের জন্য পরপারে পাড়ি জমালো।
কয়দিন পর কামালের স্কুলে যাওয়াটাও বন্ধ হয়ে গেল,সংসারের যে করুণ অবস্থা রহিমা খাতুন কি করবে কিছুই সে বুঝে ওঠে পারতেছেনা,
প্রতিদিন ছয় সাত জনের খাবার কোথা থেকে আসবে কে জোগাড় করবে...কোনদিন খেয়ে না খেয়ে ওদের দিন কাটতে লাগলো।
পাশের বাড়ির রহিম মিয়া সম্পর্কে কামালের চাচা হন,একদিন এসে বললো শুনো কামালের মা এভাবে তুমি কেমনে কি কবরা,
বলি কি কামাল'তো এখন একটু বড় হয়েছে ওকে না হয় কোন জায়গায় কামে কাজে দিয়ে দাও তোমাদের সংসারেরও একটা উপায় হবে,
তুমি যদি বলো তাহলে আমি না হয় কারো সাথে কথা বলে দেখি,
অনেক চিন্তা ভাবনার পর রহিমা খাতুন কোন কুল কিনারা না পেয়ে অবশেষে বলল ঠিক আছে ভাইজান আপনি একটু চেষ্টা করে দেইখেন।
কয়েক দিনের মধ্যেই রহিম মিয়া কামালের জন্য একটা কাজও ঠিক করে ফেললো,
কামালদের বাড়ি থেকে অনেক দূরে এক জায়গায়,ওদের বাড়িতে থাকবে খাবে বাড়ির সকল কাজ কাম করবে মাস শেষে নয়'শো টাকা মাইনে পাবে,আগামীকাল বাড়ি থেকে রওনা হবে রহিম মিয়া এসে বলে গেল।
আগের দিনের কথা মত রহিম মিয়া বাড়িতে এসে হাজির আর ডাকতে লাগলো কই কামাল তাড়াতাড়ি বাহির হও নয়টার ট্রেন দরতে হবে না হয় আবার যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে,
কান্না মাখা চোখে রহিমা খাতুন ছেলেকে বুকে নিয়ে বলতে লাগলো...আমার কলিজার টুকরো বাছাধন আমার আজ যদি তোর বাবা বেঁচে থাকতো কোনদিনও তোরে আমার কোল থেকে দূরে সরাতাম না,ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করিস বাবা আর নিজের খেয়াল রাখিস,আমাদের জন্য কোন চিন্তা করিসনা আমরা ভালো আছি,
মায়ের কান্না দেখে কামালের চোখেও পানি এসে গেল কিন্তু কি করবে তাকে যে যেতেই হবে,না হয় ভাই বোনদের কি হবে কে তাদের খাবার জোগাড় করবে।
আট নয় ঘন্টার ট্রেনের যাত্রা পার করে কামাল এসে পৌছলো রমিজ মাতাব্বরের বাড়ি,
আজ থেকে এটাই কামালের নতুন ঠিকানা,
মাতাব্বরের বড় ছেলে জমির উদ্দিন কামালকে কাজ বুঝিয়ে দিল,প্রতিদিন এই দশটা গরুর জন্য ঘাস কাঁটবে আর সংসারের অন্যান্য কাজ কর্মও করবে এই বলে সে চলে গেলো।
এভাবে কেটে যেতে লাগলো দুঃখে সুখে কামালের দিন,প্রতিমাসে মা ভাই বোনদের জন্য টাকা পাঠিয়ে দেয়,কামালের ছোট বোন ময়না একদিন ওর মাকে প্রশ্ন করে 'মা'ভাইয়া কোথায় ভাইয়া কেন আমাকে প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর আনতে যায় না ভাইয়া কি আমার উপর রাগ করেছে,তুমি ভাইকে বলো চলে আসতে আমি আর কোনদিন ভাইয়ার কাছে বায়না করবোনা দোকান থেকে চকটেল কিনে দিতে,
মেয়ের কথা শুনে রহিমা খাতুনের দু'টি চোখ দিয়ে অঝরে অশ্রু ঝরতে লাগলো,
ময়না যে ছোট মানুষ ও তো আর বুঝে না ওর ভাই চলে আসলে এই সংসার কিভাবে চলবে,কে পরিবারের সবার মুখে দু'বেলা দু'মুঠো অন্ন জোগাবে।
প্রতিদিনের মত আজও কামাল ঘাস আনার জন্য বের হবে হঠাৎ এমন ঝড় তুফান শুরু হলো বাহিরে বের হওয়ার এমন কোন উপায় নেই,
সকাল দুপুর গড়িয়ে সন্ধা হল বৃষ্টি থামবার কোন নাম নেই,ওই দিকে মাতাব্বরের বড় ছেলে জমির উদ্দিন একটু বদমেজাজি মানুষ,
এসে কামালকে জিজ্ঞেস করলো...ঘাস আনছিলি আজকে গরুর জন্য,কামাল উত্তরে বললো..না স্যার আজকে ঝড় তুফানের কারনে বাহিরে যেতে পারিনি,কথা শেষ হতে না হতেই বাড়ির উঠানের উপর কামালকে মাটিতে ফেলে ধপাস ধপাস কিল ঘুসি মারতে শুরু করলো আর বলতে লাগলো প্রতি মাসে মাসে টাকা তো ঠিকই দিই তাহলে ঘাস আনলিনা কেন,জানোয়ারটা এমন মারাটাইনা মারলো নাক মুখ ফেঁটে রক্ত বের হতে লাগলো তার পরেও ক্ষান্ত হয়নি ওর আকুতি মিনতি দেখেও তার মনের ভিতর একটুও মায়া হয়নি অবশেষে হাতের কাছে একটা কাঠের টুকটো পেয়ে ওইটা দিয়ের কামালের মাথায় আঘাত করলো,
কিছুক্ষণের মধ্যেই কামালের পুরো শরীর নিথর হয়ে গেল।
বাড়ি ফেরা আর হলোনা কামালের
দেখা হলোনা শেষ বারের মত করে মা আর ছোট ভাই বোনদের মুখ,
কি অপরাধ ছিল ওর
কেনই'বা এভাবে অকালে চলে যেতে হল তাকে এই পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে,
কে দিবে এই প্রশ্নের জবাব
আছে কি কারো কাছে এর কোন উত্তর???
০২-০৮-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।