কেউ কথা রাখেনি: ৫৫ বছরের এক দীর্ঘপ্রতারণা
- দেলোয়ার হোসাইন
কেউ কথা রাখেনি।
একাত্তরের সেই রক্তনদী পেরিয়ে ৫৫টি বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখেনি।
পাক-হানাদারের নির্মম জুলুমের হাত থেকে বাঁচিয়ে
যে মাটিতে আমরা বুনেছিলাম পরম মুক্তির বীজ,
সে মাটি আজ কেবলই শাসকের দেওয়া প্রতিশ্রুতির এক শ্মশানভূমি।
মুজিব এসে দাঁড়িয়েছিলেন ভাঙা দেশের বুক চিরে,
বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন, "কথা দিলাম, সুখে-শান্তিতে ভরিয়ে দেব এ দেশ।"
ক্ষুধার্ত, সর্বহারা জাতি সেই জাদুকরী আশ্বাসে নিজের সর্বস্ব সঁপেছিল।
কিন্তু সুখে-শান্তিতে ভরলো না সোনার বাংলা,
দুর্ভিক্ষ আর চাটুকারের থাবায় পিষ্ট হলো সাধারণের শেষ সম্বল।
স্বাধীনতার প্রথম ভোরেই মানুষ দেখলো একদল নতুন শোষকের উত্থান,
কেউ কথা রাখেনি, নেতার সেই মহৎ প্রতিশ্রুতি দিনশেষে এক নির্মম পরিহাস হয়ে রইলো।
তারপর বুটের কর্কশ আওয়াজে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে এলেন জিয়া।
ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে শোনালেন বহুদলীয় সমীরণের গল্প,
হাতে কোদাল নিয়ে নামলেন খাল কাটার এক নতুন উৎসবে।
মানুষ ভেবেছিল, এবার বুঝি ক্ষমতার মোহ থেকে মুক্ত হবে এই ভূখণ্ড,
কিন্তু সামরিক ফরমানের বেড়াজালে চাপা পড়ে গেল আসল অধিকার।
রক্তাক্ত এক অভ্যুত্থানের চোরাবালিতে তলিয়ে গেল সেই আশার আলো,
কেউ কথা রাখেনি, ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার খেলায় জাতি আবার পথ হারালো।
সেই রক্ত গড়িয়ে পড়ার সুযোগে এলেন এরশাদ— ৯ বছরের এক দীর্ঘ পাথর।
কপট আভিজাত্য আর রক্তের হলিখেলায় যিনি উঁচিয়ে ধরেছিলেন স্বৈরাচারের নির্মম চাবুক
শুক্রবার জুমার নামাজে গিয়ে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে দিলেন সস্তার বাহবা নিতে।
উপজেলা আর পিচঢালা রাস্তার ঝলমলে খোলস বুনেছিলেন ঠিকই,
কিন্তু তরুণের বুক ঝাঁঝরা করে রাজপথে তিনি লিখেছিলেন এক কলঙ্কিত অধ্যায়।
নয়টি বছর ধরে মানুষ শুধু এক শ্বাসরুদ্ধকর খাঁচায় বন্দি ছিল,
কেউ কথা রাখেনি, শুধু শোষণের এক নতুন জ্যামিতি তৈরি হয়েছিল।
স্বৈরাচার পতনের পর মহাসমারোহে এলেন খালেদা, আপসহীনতার চাদর গায়ে।
বধূ থেকে রাজপথের নেত্রী হওয়া সেই অবয়বে মানুষ খুঁজেছিল এক চিলতে স্বস্তি,
ভেবেছিল এবার বুঝি সংসদীয় গণতন্ত্রের সুবাতাসে জুড়াবে দেশের তপ্ত হিয়া।
কিন্তু শাসনদণ্ডের স্পর্শে সেই আঁচলও হয়ে উঠলো দুর্ভেদ্য এক প্রাচীর,
হাওয়া ভবনের লুটপাট আর দলের অন্ধ দম্ভে পিষ্ট হলো খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার।
প্রতিশ্রুতির রঙিন ইশতেহারগুলো শুধু ভোট ব্যাংকের সিন্দুক বন্দি হয়েই রইলো,
কেউ কথা রাখেনি, সাধারণ মানুষের কপাল সেই তিমিরেই রয়ে গেল।
বিগত দিনের সব ক্ষত ও রক্তের প্রতিশোধের কসম খেয়ে এলেন হাসিনা।
ডিজিটাল বাংলাদেশ আর মেগা প্রজেক্টের চাকচিক্যে চোখ ধাঁধিয়ে দিলেন সবার,
জিডিপির গগনচুম্বী গ্রাফ দেখিয়ে ঢাকতে চাইলেন ভেতরের সব কঙ্কাল।
অথচ অধিকারের কথা বললেই নেমে আসতো আয়নাঘরের অন্ধকার, গুম আর বুলেট;
১৫ বছরের এক নিশ্ছিদ্র, নিস্তব্ধ একনায়কত্বের জাঁতাকলে পিষ্ট হলো কোটি মানুষের বাকস্বাধীনতা।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার মহাপ্রলয়ে সেই অহংকারের তখত ভেঙে চুরমার হলো বটে,
কিন্তু কেউ কথা রাখেনি, উন্নয়নের সেই জমকালো চাদরে ঢাকা ছিল আসলে আমাদের দাসত্ব।
সদ্য ঝরা রক্তের হাহাকার আর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এলেন ইউনূস।
শান্তির নোবেলজয়ী, একবিংশ শতাব্দীর এক পরম আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্তা যেন,
বললেন, "নতুন সূর্য উঠেছে, এবার হবে রাষ্ট্র মেরামতের এক ঐতিহাসিক মহোৎসব।"
কিন্তু ফাইল আর সংস্কারের মন্থর চাকা ঘুরতে ঘুরতেই বছর পার হয়ে যায়,
এদিকে চালের বস্তায়, তেলের বোতলে আগুন লেগে মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ওঠে।
লুটপাটকারীদের চেয়ার বদল হয় ঠিকই, কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষের থালায় অন্ন জোটে না,
কেউ কথা রাখেনি, শান্তির সেই মহান বাণী আজ ক্ষুধার্ত পেটের কাছে এক তীব্র পরিহাস।
ওদিকে সুদূর প্রবাসের দীর্ঘ নির্বাসন ঘুচিয়ে এখন হুংকার ছাড়ছেন তারেক।
বলছেন, "এবার ফিরবে সাম্য, এবার ঘুচবে গত দেড় দশকের সব বন্ধ্যাত্ব।"
জনসমুদ্রে ঢেউ ওঠে, স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় নগরের আকাশ,
কিন্তু ক্ষমতার সেই চেনা সুড়ঙ্গপথের দিকে তাকিয়ে দেশের মানুষ বুক কাঁপে বারবার।
পুরনো ইতিহাসের সেই ছায়াগুলো কি আবার নতুন খোলসে ফিরে আসবে রাজপথে?
জনতার হৃতপিণ্ডে আজও তাই এক অজানা আশঙ্কার শীতল স্রোত বয়ে যায়।
৫৫ বছরের এই দীর্ঘ ইতিহাস— এ তো কোনো মহাকাব্য নয়,
এ হলো একদল তৃষ্ণার্ত মানুষের মরীচিকার পিছে ছুটে চলা।
মুজিব থেকে জিয়া, এরশাদ থেকে খালেদা, হাসিনা, ইউনূস আর এখন তারেক—
ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চে শুধু কুশীলব বদলায়, নাটকের চিত্রনাট্য থাকে একই।
এ দেশের সাধারণ মানুষের চোখের জল কোনো ঋতুতেই শুকালো না!
০৮-০৬-২০২৬
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।