ভাত ৫
- ফারহান নূর শান্ত

মাঝরাইতে কোকিলের ডাক শুইনা ঘুম ভাইঙা গ্যালো।
ফ্যানের রেগুলেটারটা নষ্ট বইলা, ফ্যানও বন্ধ হইয়া গ্যাছে।
রাইতের বেলা এইসব কাণ্ড ঘটনের আর সময় পাইলো না!

বাতরুম থেইকা এক ফোটা দুই ফোটা কইরা,
পানি পরার শব্দ আইতাছে।
এই শব্দ আমার ভাল্লাগে না।
জানলাডা খুইল্লাই শুইছিলাম।
আমার রুমের লগেই রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের লাইটটা বহুত জ্বালাইতাছে।
আলো থাকলে আমার আবার ঘুম ধরে না ঠিকমতো।

জানলার পাশ ঘেঁইষা চান্দের আলো নাইলে,
রূপকথার কেচ্ছাগুলান আর ভিড় করতাছে না আগের মতো।
জীবন থেইকা রোমাঞ্চ, সাসপেন্স, তছনছ করা কাহিনীগুলান
দিন দিন হারায় যাইতাছে।
এহন আর গপ্পে ভয় লাগে না—
মানুষের জীবনডাই এর চাইতে বেশি ভয়ানক লাগে।

চোখ মেইল্লা দ্যাখি,
টেবিলের উপরে কি জানি জ্বলজ্বল করতাছে।
উইঠা বসি।
তারপর কাছে গিয়া দ্যাখি
এক থালি ঠান্ডা ভাত, পাতলা তরকারির ঝোল, দুইডা কাচামরিচ
আমারে খুব কইরা টানতাছে।

আমি জানি,
যেই রাইতে আমি না খায়া ঘুমায়া পড়ি,
আম্মা খুব যত্ন কইরা এক থালি ভাত রাইখ্যা যায়।
মাঝরাইতে এই ঠান্ডা ভাতের লগে
আমার ম্যালাদিনের সম্পর্ক।

ভাতগুলার ভিতর আমি মাইনসের কান্দার আওয়াজ পাই।
খিদার জ্বালায় ছটফট করা মাসুম বাচ্চার যন্ত্রণা শুনবার পাই।
এই এক থালি ভাতের লেইগা,
একজন মানুষ নিজের শইলডারে কিছু সময়ের লেইগা বেইচা দেয়।
এই এক থালি ভাতের লেইগা,
ছোট ছেলেডা ওর থেইকাও বড় সাইজের হাতুড়ি দিয়া
গরম লোহাডারে পিডাইতে থাহে।
এই এক থালি ভাতের লেইগা
রিক্সাওয়ালা প্যাডেল মারতে থাহে।
ফেরিওয়ালা বয়সের চাইতেও বেশি ওজন কাঁধে নিয়া হাঁটে,
কামলা মানুষ রোদে পুইড়া কয়লা হইয়া যায়।

আর এই শহর?
এই দেশ?
ওরা টিভিতে উন্নয়নের গল্প কয়।
বড় বড় বিল্ডিং উঠে,
ফ্লাইওভারের নিচে আবার মানুষ না খাইয়া ঘুমায়।
মানুষের অধিকার নিয়া টকশো চলতাছে খুব,
কিন্তু গরিবের থালায় ভাত পাতলা হইতাছে দিন দিন।

রাজনীতির মঞ্চে মাইকে গলা ফাটে,
মানুষের হক নিয়া কথা কওয়া হয়,
কিন্তু খিদার কোনো দল নাই।
খিদার কোনো পতাকা নাই।
খালি পেট ভোট বুঝে না,
বুঝে ভাত।

এই যে রাত কইরা আমি বইসা রইছি-জাগনা ,
দূর থেইকা পাহারাদারের বাঁশির শব্দও কানে আইতাছে।
চলতাছে তার পা,
চলতাছে পায়চারি।
হয়তো সেও ভাবতাছে,
সকাল হইলে বাজারে চাইলের দাম আবার বাড়বো কিনা।

এইগুলান নিত্যদিনের কথা।
কইতে আর মন চায় না।
এতবার লেখছি,
আর লেখতেও মন চায় না।
তয় বারবার ফিইরা আসে কথাগুলান।

আমি ভাতে হাত বুলাইতে থাকলাম।
মাখাইতে মাখাইতে পাতলা ঝোলের লগে,
ভাতগুলারে গোসল করাইতাছি।
এই পেটের শান্তির লেইগা
পুরা দুনিয়ার মানুষ ছুটতাছে।
কেউ দেশ ছাড়ে,
কেউ নীতি ছাড়ে,
কেউ নিজের আত্মাটাও বেঁইচা দেয়।

আমার গলা দিয়া আর ভাত নামে না।

আমি ভাবলাম,
ওগোরে নিয়া কিছু ল্যাখুন দরকার।
যারা না খাইয়া ঘুমায়,
যারা কইতে পারে না তারা ক্ষুধার্ত,
যারা বাঁচার চাইতে টিক্যা থাকাটারে বড় যুদ্ধ মনে করে,
ওগো কথা লিখন দরকার।

ভাবতে ভাবতেই ফজরের আযান শুরু হয়া গ্যালো।
এই রাইতেও আর ঘুম হইলো না।
কলম নিয়া বইতেও পারলাম না।

সকাল দ্যাখতাছি।
মাখায় রাখা ভাতগুলার দিকে চায়া দেখি
আমারে অভিশাপ দিতাছে।

এই খিদা নিয়া কানতে কানতে ঘুমায়া পরা মানুষগুলার
আর্তনাদ আমার কাছে তুইলা ধরতাছে ও।
শরীরের চামড়া হাড়ের লগে লাইগা যাওয়া মানুষগুলার,
ছায়া ভাইসা উঠতাছে ভাতের মধ্যে।

আমি আবার আগায়া গেলাম।
সকালবেলার পাখিগুলারে,
মুঠ ভইরা ভাতগুলান ছুইড়া মারলাম।

ওরা খাইলে খাইতে থাকুক।
নাইলে ভাতগুলান নিয়া
ঐ মানুষগুলার কাছে পৌঁছায় দেক।

আমার একটু ঘুমানি দরকার।
আর ভাববার পারতাছি না।
এই পৃথিবী নিয়া,
এই দেশ নিয়া,
এই ক্ষুধা নিয়া আর ভাববার পারতাছি না।

আমার একটু ঘুমানি দরকার।

-২০২১-


১৩-০৬-২০২৬
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।


slot gacor 2026 slot gacor situs slot gacor 2026