আগের মতন গাঁও
- আশরাফুন নাহার
একদিন দেখি সে নেই ,
তাকে খুঁজতে গেলাম
খড়কুটো নয়তো কুঠুরী কাটা কোনো কাজলা পাখিনীড়ে,
দেখিনা ত তার শিশির ধোয়া কালা আখিটিরে।
আউশতোলা সেই ধুলা উড়া খোলা মাঠে,
আমার লাঠিয়ালভাই কই?-শক্ত তার লাঠিভার সব নামত কড়ুইকাঠে।
দত্তের হাটে হাজার বছর ধরে
জমত লাঠির খেলা
সাথে পুতুলনাচ,টঙ দোকানে চা বিস্ময় ঝুলত রুটিকলা,
কাঁচের চূড়ি,তালপাতা বিছুন,আর শখের শাড়ি,
তাই নিয়েই খোশমেজাজে ফিরত সবাই বাড়ি।
নাই সেই দত্তের হাট নাই
বউ , ঝিয়ের বায়না রাখার তাড়া,
একে একে ফুরোলো সবই ,বায়ুতে মিলল সারা।
সামনে এক কূঁড়েঘর দেখে থামি
এটাই মায়ের ঘর পাল্লা তার তাল
আর ছনে ছাওয়া চাল
খুব মনে আছে সে শৈশব কাল
এখানেই জন্মেছিলাম আমি।
মা-ঝিয়ে কইত গপ্প কথা মধ্যে মধ্যে কাটাকাটি
আর হাতে তাদের কাঁসা থালা বাটি,
গোয়াল নাই গরু কই?
ধলাচাঁন আর কালাচাঁন গোয়ালী ভরা কাঁচাগোবরের ঘ্রাণ
বাছুর-বকনা দোস্ত মাতেনা
লড়াই খানা গড়াই।
দেখি না আর আগের মতন তিনফসলের বারমাসী ক্ষেত
দেখিনা মাচাঙে সবজি লাউ কুমড়ো ঝিঙে
খুঁটিতে বসা রাজকারবার করত ঐ ফিঙে।
আসামী শালিক ঘুঘু নয়ত কালামাথা কুটুম থাকত বিচার শালিসে
চুপ দোয়েল- শ্যামা -ডাহুক- কোয়েল, চিঁচিঁউচিঁউ চড়ুই বাবুই হল ই বুঝি ঘায়েল।
চুপি চুপি পাতার ফাঁকে দুষ্টু টুনি টুনার লেজ কামড়ে ধরত
সেই সুযোগে স্থির স্থুলকায় লাউ একটু আড়মোড় ভেঙে নড়ত।
খরার দিনে পাব তারে নিশ্চয়ই ,আর যাবে কই
এসে দেখি নাই...একটা অলস গাঙচিল বসে একা
তার কাছে আমি পাব তার দেখা।
নাই কোথাও নাই কিছু আগের মতন।
গাঙে জল নাই নাই ছোট্ট সে ডিঙা নৌকার মত কিছু,পাল সে সযতন।
আর কিছুদূর যাব
সোজন বাদিয়ার ঘাট পেরুলে
একমনে কয় সেথায় গেলে গাঁওখানি মোর পাব।
ঘাট মেলা পিছ ফেলে এলাম একটু হলাম ক্লান্ত,
ইশ!শুনতাম যদি রাখালীর বাঁশি মনটা হত শান্ত।
নাই কিছু আগের মতন
কেউ করেনি সমাদর তারে কেউ করেনি যতন।
নকশি কাঁথার মাঠ বিলীন বোশেখির আগ্রাসী তান্ডবে
শোকে বরষায় বুক ভাসিয়েছে জানল না কেউ কবে।
এখানে সেখানে ছড়ানো তো নাই সবুজ ধরণ সুখ?
দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছেতাই নাই সোনা বরণ মুখ।
শষ্যেলুকানো মৃদু বাসে মগ্ন বাতাস নাই
মাটি লেপা কুটির জুঁড়ে সোঁদা গন্ধ উধাও
কইশিংয়ের আশায় নাই তাই
গাঙে আর যাবে না বগা
ফিঙের শাসন নাই পাখিপ্রজাতি নাই বলে নুয়েছে লাউ ডগা।
আশা না আর আশা নাই
পাব না খুঁজে আর তারে
তবু কেন মিছে খুঁজে যাই আমি খুঁজি বারেবারে।
পল্লী আমায় কবেই দিয়েছে ডাক,
নিমন্ত্রণপত্র ঝরেছে আয় আয়রে আমার বুকে থাক।
এতকাল পরে এসে দেখি
কালের কূলে হারাল সেকি!
দুপা কাঁপে পিচঢালা পথে হাঁটতে
দুহাত তুলে প্রার্থনায় চিৎকার করে বলি,
ফিরিয়ে দাও
আমার সবুজ গাঁও।
আমি একটু শান্তিতে অন্তিম শ্বাস ফেলি।
০৬-০৬-২০২৩
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 1টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।