কবি রুকসানা হকের "নারীর গল্প"
- রফিকুল ইসলাম রফিক

স্রষ্টা কর্তৃক সৃষ্ট মানুষের দুইটি রূপের একটি পুরুষ আর একটি নারী। মূল রহস্য স্রষ্টাই ভাল জানেন। ক্ষুদ্র জ্ঞানের এই মানুষ হিসেবে আমরা যা দেখি আকারে-আকৃতিতে, নানাবিধ বৈশিষ্ট্যে ততটুকুই বলা সম্ভব। মানব সৃষ্টির রহস্য তিঁনিই ভাল জানেন। তাঁর সৃষ্ট প্রথম মানবের শুন্যতা, অভাবের পরিপূরক হিসেবে সৃষ্টি হলো প্রথম মানবী। শুন্যতা পূরণ হলো প্রথম মানবের। এখানে কে শ্রেষ্ঠ তা বিতর্কিত। তবে একে যে অপরের পরিপূরক, একে অপরকে ছাড়া যে অচল তা আমাদের এই মানব জীবনে প্রতিষ্ঠিত সত্য। এর পরেও আমরা ক্ষু্দ্র জ্ঞানের মানুষেরা নারী আর পুরুষের বিভাজন, কে বড়, কে ছোট, বিশেষত পুরুষেরা নারীকে নিচের সারিতে রাখতে পছন্দ করি, রাখিও। কিন্তু একে অপরের পরিপূরক, একে অপরের শুন্যতার পূর্ণতা দানকারী না ভেবে বিভাজন কলহে লিপ্ত থাকি। একজন পুরুষ যেমন একা সম্পূর্ণ নয়- একজন নারীও তেমনি। আসলে এ'দুয়ের সম্মিলিত সমন্বিত রূপই হলো পূর্ণরূপ মানুষ। তারই একটি রূপ নারী।
গাঁয়ের ছেলে হিসেবে জারী ও পালা গানে এই বিতর্ক বেশ দেখেছি। কবি, জারীর গায়কগণ কিন্তু শেষমেষ কেউ কাউকে উপরে না উঠিয়ে দুইয়ের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। দুইয়ের সম্মিলিত সমন্বিত রূপই যে পূর্ণরূপ মানুষ সেটিই তারা দেখাতে চেয়েছেন, বুঝাতে চেয়েছেন। তবু কিন্তু আমরা বুঝিনি, মানিনি। জারী- পালা শুনে মনের খোরাক মিটিয়ে বাড়িতে গিয়ে যে যার মতো অটুট থেকেছি স্বরূপে। তাই জীবনের গল্পে পুরুষ যেমন হয়ে গেছে আলাদা- নারীও তেমনি। আমরা হয়ে উঠতে পারিনি মানুষ। তাই সমন্বিত মানুষের গল্প সৃষ্টি না হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে পুরুষের গল্প, নারীর গল্প। এটিই বাস্তব জীবন ও জগতের প্রতিষ্ঠিত সত্য। এমনি অসাধারণ চেতনা সম্বলিত সৃষ্টি জীবন শিল্পী কবি রুকসানা হকের " নারীর গল্প"। এমনি অসাধারণ শিল্পকর্মের আলোচনা আমার মতো অধমের পক্ষে সম্ভব নয়। তবুও লেখাটি পড়ে নিজেক সামলাতে পারলাম না। তাই আমার এই সামান্য চেষ্টা। প্রিয় পাঠক ভুল হলে ক্ষমা করবেন।
যে যাই বলুক পুরুষ শাসিত আমাদের এই সমাজে আমরা নারীকে ফেলে দিয়েছি নিচের সারিতে। কেড়ে নিয়েছি তার নিজস্ব আকাশ। যেখানে নেই তারার ঝলকানি, রূপালি চাঁদের আলো। যা হয়ে গেছে পুরুষ কর্তৃক দখলকৃত। তাই সে শুন্যতার প্রতীক, নীরবতার মানচিত্র, কেন্দ্রভূমিহীন। পাখির গল্প শুনে নিজেকে উন্মোচন করেও নারী পাখি হতে পারিনি। থেকে গেছে নারীই।
মেঘের ভাজ থেক অন্ধকার খেয়ে নারী নিজেকে নিয়ে যায় আরো বেশি অন্ধকারে। প্রচন্ড ভূকম্পনে, রাতভর নক্ষত্র পতনেও নারীকে থাকতে হয় নীরব। সময়ের স্বচ্ছ জলে যদিও বা দোল খায় নারীর দুইখানি পা, তবে তা সময়েই হারায়। কারন নারী মানেই বন্ধকী পালক। তাই দুঃখ ছাড়া তার কোন স্বপ্ন থাকে না। নারী জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম এমনি বিশ্লেষণ সুগভীর জীবনানুভূতি সম্পন্ন জীবন শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।এমন অনবদ্য কাব্যসুষমা মন্ডিত একটি কবিতা উপহার দেবার জন্য কবিকে জানাই হৃদয়ের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও অভিনন্দন। প্রিয় পাঠক কবির পুরো কবিতাটি নিম্নে উল্লেখ করলাম। আশাকরি ভাল লাগবে কবির এই অনবদ্য সৃষ্টি।
নারীর গল্প // রুকসানা হক
---
একটা পাখির গল্প শুনে নারী নিজেকে উন্মোচন করে
সে পাখি হতে পারেনি
হয়েছে নারী ,
নারী মানে নীরবতার মানচিত্র ,
এক বুভুক্ষু বিপন্নতা
নারীদের নিজস্ব কোন আকাশ থাকে না
জলের বুকে জেগে থাকা বৃক্ষের ডালে
নারীরা যুগ যুগ ধরে বসে থাকে
তাদের কোন কেন্দ্রভুমি থাকে না ।
-
নারী নিজের বুকের ভেতরের শাদা কাগজে
শ্যাওলা ও শঙ্খের গুড়ো ওড়ায়
শূন্যতার গল্পে বেদনা রাখে
নারী অবিচল থাকে
প্রচন্ড ভূকম্পনে ,
নীরব থাকে
রাতভর নক্ষত্র পতনে ।
ব্যথাতুর নারী জলঝর্নার কাছে অশ্রুসিক্ত হয়
স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘে পা নাচায় বেদনায় ।
-
পাখি হয়ে না ওঠার দুঃখে নারী আকাশ খুঁজে না ,
মেঘের ভাঁজ থেকে অন্ধকার খায় ,
কদমের রেণুতে ছোঁয়ায় বিষ
চকচকে পুরুষ পাথরে রাখে তীব্র আগুন ।
নারী মানেই বন্ধকী পালক
পাখিদের চোখের রোদ ,
জমানো সংকেত ,
নারীর বুকে থাকে একরাশ শীতশূন্যতা
দু'পশলা বৃষ্টির অভিমান ।
-
কেউ বুঝে না জ্যোৎস্নালুপ্ত চাঁদের দুঃখ ,
কচি ঘাসে শুয়ে থাকা গভীর কুয়াশার বেদনা
যা কেবল নারীর সাথেই মানায় ,
নারী তো আগুনের পুতুল ,
মর্গের পোশাক ,
দ্রৌপদীর তৃষ্ণা
সিঁড়ির ধাপে ধাপে কম্পিত মূর্তি ।
নারী তাই মাটি ও আকাশের গায়ে বিছায় নীল সত্য
কারন ভালবাসা ছাড়া তার নিজস্ব কোন ভাষা নেই
দুঃখ ছাড়া তার কোন স্বপ্ন নেই ।


০৬-০৬-২০২৩
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।