কবি এবিএম সোহেল রশিদের "শামুক কামড়"
- রফিকুল ইসলাম রফিক
কবি এবিএম সোহেল রশিদের "শামুক কামড়"
রফিকুল ইসলাম রফিক
আপন অক্ষমতার ভয়ে কিছু লেখকের লেখায় আমার হাত চলে না। মন চাইলেও কিছু লিখতে পারি না। তাদের সুগভীর জীবনানুভূতির আলংকরিক সূক্ষ্ম চিত্রায়ন এতটাই গভীর যে সেখানে কলম চালানো এই অধমের পক্ষে আসলেই সম্ভব নয়। কিন্তু তবুও আজকের এই লেখাটি পড়ে এতোটাই আপ্লুত হয়েছি, অন্তর দোলায় দোলায়িত হয়েছি তা আমি প্রকাশে অক্ষম। এর শব্দ ও ভাষা, ব্যবহৃত রূপক, অলংকারের মধ্যে নিহিত অর্থ আমি বুঝি নাই ঠিকই। যে জ্ঞানের গভীরতা থাকলে কোনো লেখায় কিছু বলা যায়, আলোচনা করা যায় - আমি জানি তা আমার নেই। কিন্তু এই কবিতার ভেতরে নিহিত কী যেনো সুরের মুর্ছনা আমাকে আন্দোলিত করেছা, তাড়িত করেছে। তার কারনে আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না। তাই আমার কিছু অভিব্যক্তির প্রকাশ।প্রিয় পাঠক ত্রুটি ক্ষমা করবেন।
সময় বয়ে যায় তার আপন গতিতে। মানুষও মিশে যায় সময়ের গায়ে। প্রবহমান এই গতির নামই তো জীবন। সময় যেভাবে চালায় মানুষকে চলতে হয় সেইভাবে, সেইরূপে। কেউ পারে, কেউ পারে না। চলমান পথে অরক্ষিতভাবে রক্ষিত কংক্রিটে হোছট খায় জীবনের গতিপথে তালমিলিয় চলতে না পারা এই মানুষগুলো। সময়ের ঝড় আসে এদের জীবনেই, লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায় সব। তাই এরা মেলাতে পারে না-জীবনের পাঠ, গণিতের হিসাব।এরাই হারিয়ে ফেলে জীবনের স্বপ্নিল সময়, পবিত্র সকাল, প্রেমময় ছন্দের দোলা এরাই হারায়। এমনি এক অসামান্য জীবন চেতনা সমৃদ্ধ কবিতা কবি এবিএম সোহেল রশিদের "শামুক কামড়"।
মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। এই স্বপ্নকে নিয়েই বাঁচতে চায়, পাড়ি দিতে চায় জীবনের পথ। কিছু প্রাপ্তির পূর্বাভাস তার জীবনে নিয়ে আসে সুখময় কিছু অনুভব, কিছু তৃপ্তি। বোধের কপাট উন্মুক্ত করে সে মেতে ওঠে কাব্যকলার বৈকালিক স্তুতিতে। আনন্দে আন্দোলিত হয় তার স্বপ্নের আনন্দলোক। এই তো জীবন। পূর্ববর্তী পাঠ শেষ পরবর্তী পাঠের প্রস্তুতি। কিন্তু ঐ হিসাবের ভুল, সূত্র বিভ্রাট সবকিছু করে দেয় এলোমেলো। আনন্দময় নাগরদোলা, মনকাড়া বাউলা গানের সুর, মেহেদী আলতায় পুষে রাখা স্বপ্নের লজ্জা মেলায় বসা নানাবিধ পসরার আনন্দময় পরিবেশ হারিয়ে ফেলে সে। সূত্র বিভ্রাটে হয় চেতনাও এলোমেলো। হাজার পৃষ্ঠার গবেষণাপত্র তাই চানাচুর মোড়ক হতে চলে য়ায় কারখানায়। শিল্পোত্তীর্ণ নান্দনিকতাও তাই হয়ে ওঠে ছকে বাধা শরীরবিদ্যা। মানুষের কামুক প্রবৃত্তি হয়ে যায় শামুকের কামড়ের মতো। সম্বিত ফিরে পেয় ফিরতে চাইলেও- তা আর হয়ে ওঠে না। কারন ফেরে না সময়। কবির ভাষায়-
শিল্পোত্তীর্ণ নান্দনিকতা ছকে বাঁধা শারীরবিদ্যা
এখানে স্বরূপ বদলায় শোয়াপোকা আর ভিমরুল।
সদ্য ঋতুমতী গোলাপ রঙ দর্শনে শিহরিত বারবার
সাপের ফণায় আঁতকে উঠে না এখন পূর্ণ জোয়ার।
সাপের ফণায় আঁতকে উঠে না এখন পূর্ণ জোয়ার।
কামুক ঠোটে শামুক কামড়
নিন্দা ঝড়ে ভাঙ্গে নিদ্রা
ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিতে
ফিরে শুকনো ঘাস ঠোটে পাখি
ফিরে না শৈশব প্রেমমুদ্রা।
সময়ের অনবদ্য জীবনচিত্র সম্বলিত অনুপম কাব্য সুষমা মন্ডিত এমন সুন্দর একটি কবিতা উপহার দেবার জন্য কবিকে জানাই অন্তরের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও অভিনন্দন। প্রিয় পাঠক কবির পুরো কবিতাটি নিচে তুলে ধরলাম।
শামুক কামড়
।।এবিএম সোহেল রশিদ।।
শুনেছি হেমন্ত মৃত্তিকায় রাখবে পা
সঞ্চয়ে রেখেছি ধানের সোনালী রঙ
আউশ আমন চালের পিঠা পিঠুলি
নবান্ন উৎসবের সা রে গা মা পা
মাঠে যোগ বিয়োগের হাজার চিহ্ন
হিমঝুরি দেবকাঞ্চন রাজ অশোক
গন্ধরাজ মল্লিকা শিউলি কামিনী
কামুক সৌরভে কাঁপে আনন্দলোক
বৃক্ষ লতার মৈথুনে উন্মুক্ত বোধের কপাট
বাকল ত্বকে কাব্যকলার বৈকালিক স্তুতি
পূর্ববর্তী পাঠ শেষে পরবর্তী পাঠের প্রস্তুতি
জ্যামিতি ও ত্রিকোনোমতির সূত্র বিভ্রাট
অংক সমাধানে অঙ্গে অঙ্গে ঘুমন্ত রঙ
জীবনের বাঁকে নাগরদোলা বাউল গান
লাঠিখেলা কিংবা বাঁশির রক্তঝরা কান্না
মেলায় সখের চুড়ি খৈ মোয়ার পসরা
মেহেদী আলতায় বুকে পুষে রাখা লজ্জা
সবুজ পাতার উনুনে হেমন্তিকার রান্না
বিক্ষুব্ধ উইপোকার আক্রমণে থেলিসের দর্শন
তবু এরিস্টটল তত্ত্বে পরাজিত নতুন মতবাদ
হাজার পৃষ্ঠার গবেষণাপত্র চানাচুরের মোড়ক
মৃত্তিকা বৃক্ষ লতা সূর্য নদী বৃষ্টি প্রাণের আশীর্বাদ
সমুদ্র রোমন্থনে ভিজে কদাকার উভয় শরীর
এক ডুবে স্বর্গ দর্শন আরেক ডুবে দোযখ বর্জন
দ্বৈত পাহাড়ের চুড়ায় নিঃসঙ্গ নয় পুষ্ট জামরুল
রাত দিনের কানামাছি খেলায় পরিবর্তনের ডাক
শিল্পোত্তীর্ণ নান্দনিকতা ছকে বাঁধা শারীরবিদ্যা
এখানে স্বরূপ বদলায় শোয়াপোকা আর ভিমরুল।
সদ্য ঋতুমতী গোলাপ রঙ দর্শনে শিহরিত বারবার
সাপের ফণায় আঁতকে উঠে না এখন পূর্ণ জোয়ার।
কামুক ঠোটে শামুক কামড়
নিন্দা ঝড়ে ভাঙ্গে নিদ্রা
ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিতে
ফিরে শুকনো ঘাস ঠোটে পাখি
ফিরে না শৈশব প্রেমমুদ্রা।
০৬-০৬-২০২৩
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।