জীবনের গল্প ১ (না বলা কথাটি)
- অনির্বাণ মিত্র চৌধুরী

শেষ পর্যন্ত আমি তোমাকে বলতে পারি নি
সেই কথাটি। - হয়তো যে কথাটি
তুমি আমার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলে।
কোনোদিন সাহস করে বলতে পারি নি;
বলবো, বলবো করেও সে কথা বলা হয় নি।

কলেজ ক্যান্টিনের সেই প্রথম দেখায়
ভীষণ ভালো লেগেছিল তোমায়!
তুমি অদ্ভুত হাসি হাসছিলে,
ছোট্ট একটা টোল পড়েছিল তোমার গালে।
উফ্ִ, কি মারাত্মক সুন্দর লাগছিল তোমায়!
সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারি নি।

এরপর দেখা বাস স্টেশনে।
বাসে উঠছিলে তুমি, হয়তো আনমনে।
উঠতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যেতে চাইলে;
তোমার পিছনেই আমি ছিলাম,
আমার গায়েই ধাক্কা খেলে।
একটু রেগে গিয়েছিলাম সেদিন
জানতাম না তো আসলে তুমিই ছিলে!
"স্যরি" – অপরাধী গলায় বললে তুমি,
"ইটস ওকে" – বলতে গিয়ে গলাটা কেমন শুকিয়ে গেল!
আবার তুমি হাসলে; তবে এবার মুচকি হাসি।
ভীড়ের মাঝে কখন যে নেমে গেলে বুঝতেই পারি নি,
তারপর তোমায় কত খুঁজেছি
তবুও তোমার দেখা মেলে নি।

ভেবেছিলাম তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি শত লোকের ভীড়ে
যেভাবে ভোরের শিশির হারিয়ে যায় রবির কিরণে।
কি যেন পেয়েও আবার হারালাম!
প্রচন্ড রকমের আক্ষেপ জমা হচ্ছিল মনে।
সেদিন যথারীতি কলেজ যাবার জন্য বাসে উঠেছি
উঠে দেখি একটা সিটই খালি আছে;
কিন্তু মনে হল পাশের সিটে একটা মেয়ে!
অস্বস্তি লাগে – তাই বসতে চাই নি।
হঠাৎ কৌতুহলবশতঃ চোখ পড়তেই দেখি
ওমা, একি। এতো তুমি!
তোমার সাথে আবার দেখা হবে হয়তো ভাবি নি
আমাকে দেখেই হয়তো একটু নড়ে-চড়ে বসলে
আর আমায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললে –
"বসুন না এখানে।"
কেন জানি না নিয়ম ভেঙে বসে গিয়েছিলাম সেদিন
এভাবে কোনোদিন কোনো অচেনা মেয়ের পাশে বসি নি।

সেদিন অন্যরকম উত্তেজনায় কথা গুলিয়ে যাচ্ছিল
আর প্রথমেই নীরবতা ভাঙলে তুমি
আমিও ধীরে ধীরে কমফোর্ট হতে শুরু করলাম।
পরিচয়টা মোটামুটি জানা হয়ে গেল;
আমার পরিচয়টাও দিলাম।
কলেজের সামনে বাসটি দাঁড়াতেই
তুমি নেমে গেলে, আমিও নামলাম।
নিজেকে সামলে নিয়ে ক্লাসের দিকে ছুটলাম।
ক্লাসে সেদিন একদম মন বসাতে পারি নি।

ক্লাস শেষে দাঁড়িয়ে ছিলাম ক্যাম্পাসে
তোমার আসার অপেক্ষায়
একে একে সবার ছুটি হয়ে গেল
তবু তোমার দেখা নাই।
বিষন্ন মনে ফিরে যাবার ক্ষণে
কেন জানি না আরেকবার ফিরে তাকালাম আর দেখলাম
তুমি একা একা সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলে
আমি যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।
এলোমেলো হাওয়ায় তোমার চুলগুলো উড়ছিল
অনেকটা সিনেমার নায়িকাদের মত।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম
আর আরও একবার তোমার রুপে মুগ্ধ হলাম।
হয়তো তুমি আমাকে সেদিন আর দেখো নি
আমিও হ্যাংলার মত তোমায় দেখা দিতে চাই নি।
চোখের সামনে দিয়ে তুমি বাসে উঠলে
আর আমিও বাসায় ফিরলাম, তবে সেই বাসে উঠি নি।

এরপর থেকে এক অন্যরকম ছট্ִফটানি
তোমাকে দেখার জন্য কত পাগলামী।
লুকিয়ে লুকিয়ে তোমায় কত ফলো করেছি!
রাত দিন শুধু তোমায় নিয়েই ভেবেছি।
প্রতিদিন কলেজে যাওয়া-আসার ফাঁকে
তোমাকে দেখার জন্য কত বাহানা করেছি
ক্যান্টিন, লাইব্রেরী - সর্বত্র তখন আমার অবাধ বিচরণ
শুধু মাত্র তোমায় এক পলক দেখার জন্যে।
কলেজ ক্যাম্পাসে বন্ধুদের আড্ডায় যোগ দিয়েছি
আড্ডার ছলে তোমায় দেখবো বলে।
যখন আমার দিকে তোমার দৃষ্টি পড়ত,
যখন তুমি সেই চোরা হাসি হাসতে
সত্যি বলছি, কি জানি হত মনের ভিতর
মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকতাম তোমার দিকে।
দিনগুলো কেমন যেন ঘোরের মধ্যে কাটছিল
বন্ধু মহলেও ব্যাপারটা আর অজানা রইলো না।
সেদিন ক্লাস থেকে ফিরছি
আর মনে মনে তোমারই কথা ভাবছি।
হঠাৎ দেখি ক্লাসের এককোণে
তুমি যেন কাঁদছো বসে আপন মনে।
ছ্যাঁৎ করে যেন ছ্যাঁকা লাগলো বুকে।
"এক্সকিউজ মি" –বললাম ক্লাসে ঢুকে।
মুখটা তোমার রাঙা হয়ে গিয়েছিল
হয়তো লজ্জাই পেয়েছিলে!
"হাই" –চোখ মুছে হাসার ভান করে বললে
কেন যে সেদিন ওভাবে কাঁদছিলে তুমি, বুঝতেই পারি নি।

তারপর বেশ কিছুদিন ধরে তোমার দেখা নাই
উৎকন্ঠাকে সঙ্গী করে অনেক খুঁজেছি তোমায়।
বন্ধুরা যে কত মজা করতো এটা নিয়ে
সবকিছু মুখ বুজে শুধু গেছি সয়ে।
দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাসও প্রায় যায়-যায়
তোমার কোনো খোঁজই পাই না।

অবশেষে শুনেছি তোমার নাকি বিয়ে
তুমি অন্যের হয়ে যাবে ভাবতেই দু'চোখ জলে ভিজে।
আর নিজেকে খুব গালি দিতে ইচ্ছে করে
কেন যে মনের কথাটি সাহস করে
তোমার সামনে মুখ ফুটে বলতে পারি নি?
কেন যে বলতে পারি নি সেই একটি লাইন–
"আমি তোমাকে ভালবাসি"
একি! কত সহজেই না আজ বলে ফেললাম
এতোদিন ধরে মনের গোপণ ঘরে জমে থাকা না বলা কথাটি।
কিন্তু, বড্ড দেরি হয়ে গেল যে!


০৬-০৬-২০২৩
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।