জীবনের গল্প ২ (বর্ষা ও কান্নার গল্প)
- অনির্বাণ মিত্র চৌধুরী
মেয়ে, দেখ ঝুম বৃষ্টি নেমেছে আজ আমাদের শহরে
ভিজে যাচ্ছে রাস্তাঘাট, ভিজে যাচ্ছে কালভার্ট
ভিজে যাচ্ছে ইট পাথরের উঁচু নিচু দালান,
দালানের ছাদে ছোট চারাগাছ, ফুলের বাগান
ভিজে যায়,
বর্ষার কান্নায়.......
মনে পড়ে মেয়ে, এই বৃষ্টিতে কত ভিজেছিলাম দু'জন,
আমার চাতক দৃষ্টি কেবল তোমার উচ্ছ্বলতায় সিক্ত হতো,
বেমালুম ভুলে যেতে তুমি চারপাশে আরো লোকজন
আড়দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি যেন বিড়বিড় করে বলতো।
তুমি তো পরোয়াই করতে না তাদের!
আমি কিছু বলতে গেলেই ফুঁসে উঠতে আমার উপর
যেন সমস্ত দোষ আমার!
তারপর চুপচাপ চলে যেতে অভিমান সঙ্গী করে
আর আমি ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকতাম নির্বোধের মতো।
এরপর কিছুদিন মান-অভিমানের পালা চলতো
মান ভাঙানোর কত শত চেষ্টা, কত অনুযোগ
তুমি গ্রাহ্য করতে না কিছুই, বারংবার ফিরিয়ে দিতে
তবু সুযোগের অপেক্ষায় উপেক্ষিত সব দূর্যোগ।
হঠাৎ করেই তোমার একটা মেসেজ আসতো
কবে, কোথায় দেখা হবে সবিস্তারে লেখা থাকতো তাতে
জানো, আনন্দাশ্রু গড়িয়ে যেত আমার কপোল বেয়ে,
খুশিতে ডগমগ আমি যেন ঈদের চাঁদ পেয়েছি হাতে।
নির্ধারিত দিনে, নির্ধারিত স্থানে, নির্ধারিত সময়ের আগে
হাজির হয়ে যেতাম আমি একগুচ্ছ ফুল হাতে।
প্রতীক্ষার মুহূর্তগুলো যেন ফুরোতেই চাইতো না;
তারপর তুমি আসতে।
কি দারুণ লাগতো তোমায় শাড়িতে!
মনের গহীনে জমানো কথাগুলো যেন এক নিঃশ্বাসে
বলে শেষ করে দিতে চাইতে দম ফুরোনোর আগে।
আর আমি নির্বাক শ্রোতা হয়ে সব শুনতাম মুগ্ধ প্রাণে
সেই স্মৃতি মনে পড়লে এখনো বুকে শিহরণ জাগে।
তারপর হঠাৎ একদিন জানি না তোমার কী যে হলো!
দেখা করবে বলে ডেকেছিলে তোমার প্রিয় প্রাঙ্গণে
এক ছুটে পৌঁছেছিলাম, দেরী হয় নি খুব
যথারীতি একগুচ্ছ ফুল হাতে, দাঁড়ালাম তোমার সামনে।
তোমার চোখ দিয়ে অশ্রুর ঝর্ণাধারা বইলো হঠাৎ!
আমি নিথর হয়ে বসে রইলাম; তুমি মাথা রাখলে আমার কাঁধে।
কারো মুখ থেকে কোন কথা বেরোয় নি সেদিন
শুধু মনে মনে অনুভব করেছি, আর জড়িয়েছি মনের বিবাদে।
তারপর থেকে তুমি আর "নেই" হয়ে গেলে
খুঁজেছি তোমায় কত হন্য হয়ে উদভ্রান্তের মত।
ঠিকানা পাল্টেছো,– বলার প্রয়োজনও মনে করোনি;
দুশ্চিন্তারা বারেবার হেনেছে আঘাত কত-শত।
হঠাৎ একদিন একটা পার্সেল এলো ডাক মারফতে
খুলে দেখি ফেলে আসা একগুচ্ছ সুখস্মৃতি,
সাজানো ছিলো কল্পিত ভবিষ্যতের ইতিবৃত্ত,
আরও সঙ্গে ছিলো তুমিহীন পৃথিবীতে সুখে থাকার আকুতি।
এভাবেই মেয়ে তুমি হারিয়ে গিয়েছিলে অকালে
যেভাবে খসে যাওয়া তারা আর ফিরে আসে না,
তুমিও আসো নি আর ফিরে।
যেভাবে বনের পাখি পোষ মানে না সোনার খাঁচায়,
তুমিও পোষ মানো নি,
ঠাঁই নিয়েছো অচিন আকাশে।
সেদিনও আকাশে মেঘ ছিলো, বর্ষন ছিলো অঝোর ধারায়
ভিজে ছিলো রাজপথ, ভিজে ছিলো মেঠোপথ
প্লাবিত হয়েছিলো পোড়ামন হৃদয়ের কান্নায়।
মেয়ে, শুনতে কি পাও সেই কান্নার ধ্বনি?
তুমি শুনতে কি পাও?
০৬-০৬-২০২৩
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।