আজ ৬ শ্রাবণ ১৪২৬, রবিবার

রাহুর গ্রাস
- রবিন - বেলা অবেলা

শনির দশায় আবর্তিত সময়,
প্রতিনিয়ত তাকে পাল্টানোর অভিপ্রায়।
কথা দিয়ে সেই দশা পাল্টানো যায়!
কালের ঘুর্ণিতে দিন ছুটে চলে,
রয়ে যায় মায়া— ফেলে আসা পিছুটানে
বেঁচে থাকে হৃদয়ে ফিরে আসার আকুতি, আর—
কথা দিলে শুধু দেনা বেড়ে যায়,
কথা রাখা বড় দায়।

মাঝরাতে জরাগ্রস্থ খোকা যখন প্রশ্ন করে যায়,
"মা! ভোর হতে আর কত দেরি?"
মধুর সুরে জননী বলে, "এইতো সোনা, হয়ে এলো।"
রাতের স্তব্ধতা ভেঙে ঝিঁঝিঁ ডেকে যায় অনর্গল,
থেকে থেকে নিশীথ প্রহরে শেয়ালেরা হাঁকে
হুক্কা হুয়া ডাকে।
নিশুতির কোল জুড়ে ভেসে আসে হুতোমের কান্না
কিংবা দাড়কাকের বুক ভাঙা কর্কশ কা-কা,
সুদীর্ঘ রজনীর তবুও হয় না শেষ।
মমতাময়ীর সান্ত্বনা হয়ে থাকে রক্ষা কবচ, তবু—
কথা রাখা হলো দায়।

রাস্তার ধারের পাগলীটারে গড়েছে মহান স্রষ্টা
পরম মমতায়,
রাজ্যের যতো দুর্ভাবনায় ফেঁসে থাকে তার মাথা!
সময় তবু আর থাকে না থেমে
দিনে দিনে সে হয়েছে ডাগর আস্তাকুড়ে,
সুগঠিত হয় তার ওষ্ঠ্য, অধর, পয়োধর, যোনি
রজঃচক্রের জ্বালাটাও তারে এড়িয়ে যায়নি;
অজ্ঞাতসারে হেলায় অঙ্গে করেছে ধারণ
মাতৃত্বের সকল আয়োজন,
তবুও কেন যে তার একটা সংসার মিলেনি!

লোকালয়ের পাশে পরিত্যক্ত টিনের চালার নিচে
হাড্ডিসার মাদী কুকুরটা ছানা দিয়েছিল;
চারখানা ফুটফুটে।
কেউ কাছে এলে হায়েনার মতো দাঁত দেখাতো
ভয়ঙ্কর গর্জনে সন্দেহভাজন শত্রুদের তাড়িয়ে এসে
শাবকের মুখোমুখি হয়ে বলতো, "ভয় নেই বাছা।"
মায়াময়ী পরম আদরে চেটে দিতো ওদের তুলতুলে গা।
মায়াহীন জনপদে সঙ্কুলান হয়নি সেইসব দুধের শাবকেের,
চোখের জলে বুক ভাসে নেড়ির অস্ফুট বেদনায়—
কথা রাখা বড় দায়।

বয়োবৃদ্ধ বাবা মজুরি খেটে খায়
শরীরটা তার কুলোয় না ভালো আজকাল,
শুকনো মুখে সরল হাসিতে মার্বেলের মতো চোখে
চেয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল।
ছেলেটারে সে লায়েক করেছে জীবন যৌবন ক্ষুইয়ে,
ছেলে তারে আর চিনে না ভালো, চোখের ছানিতে।
হতভাগী মা অশ্রু ঝরায় আশায় আশায়,
ভুল ভেঙে তবু ছেলে যদি কভু মুখ তোলে চায়!

কিশোর বেলায় বৈশাখী মেলায় ঘুড়ি কিনেছিলাম
মনের সুখে উড়াবো বলে—
পড়ন্ত বিকেলে প্রাণ জুড়ানো পুবাল হাওয়ায়।
উড়েছিলো সে উঁচুতে, অনেক উঁচুতে,
মাঞ্জা মারা প্রকান্ড একটা ধাউস ঘুড়ি
কোত্থেকে এসে কেটে গেলো তার মোলায়েম সুতো,
নাটাইটা শুধু রইলো আজো এই নস্টালজিক হাতে।

পাড়ার সকলে দলবেঁধে যখন সাইকেল চালাতো,
চুপিসারে দিদি মায়ের কাছে এসে খুব করে চাইতো
একটা রঙিন দ্বি-চক্রযান।
বটবৃক্ষহীন টানাপোড়েনের সংসারে সাড়ে চার হাজার টাকা!
মায়ের বকুনিতে আমার দিদির পরীর মতো মুখে
নেমে আসতো নিকষ অন্ধকার।
সাদা কাগজ আর পেন্সিলখানা বাড়িয়ে দিয়ে
বায়না ধরলে এঁকে দিতো দিদি তার স্বপ্নের রঙে
ভারি সুন্দর সাইকেল!
কোমল চুমুতে তার মিষ্টি গালে বিকশিত হতো অমাবস্যার চাঁদ।
এখন আমার পকেটে আছে বেকার সাড়ে চার হাজার,
আমার দিদির স্বপ্নটা এতোদিনে পুড়ে হলো ছাই—
নিজের কাছেই নিজেকে দেওয়া কথা রাখা হলো দায়।

নিধির সাথে ছোট্ট বেলার পুতুল পুতুল বিয়ে
বউটারে কতো যে সাজাতো বসে এবেলা ওবেলা!
আহ্লাদি সুরে বলতো পুতুলের বরটারে ধীরে ধীরে,
মাইনে পেলে লালশাড়ি আনিও, একটাও নাই ঘরে।
মাস শেষে এখন মাইনে পাই, জানে কিনা কীজানি নিধি!
লালশাড়ি দিলে ভেঙ্গে যাবে তার বাঁধানো সংসার,
কথা রাখা বড় দায়।

অনেক দিনের লালিত স্বপ্নে একটা পুকুর বেঁধেছিলাম
জলের অতলে অনেকগুলো স্বপ্নও পোষেছিলাম;
উপরে, নীচে, মাঝারি স্তরে।
জলজ আদরে বেড়ে ওঠা সব বাড়ন্ত স্বপ্ন
অগোচরে কোন এক পানকৌড়ি এসে
খেয়ে সব উজার করে দিলো!
হেলায় অভিমানে সেই স্বপ্নহীন জল
ধীরে ধীরে পর্যবসিত হলো মজা পুকুরে।

ছোট্ট একটা ভেলা বুকে চাপিয়ে
নেমেছিলাম তীর হারা ওই সিন্ধু জলে,
হোক না ছোট, আমায় সে ভাসাতে তো পারে!
অতি সুখে হয়ে টইটম্বুর, আমি যেই না ভেসেছি—
নীরবে হেসেছে বিধাতা।
উত্তাল ঢেউয়ে মাঝ দরিয়ায় লণ্ডভণ্ড হয় ভেলা,
পড়ে থাকি তাই একেলা একা অকূল পাথারে।

মেতেছিলো যখন বসন্ত ফুলে মন, বলেছি তখন
"বুকের পাজরে রাখবো ধরে এই বসন্ত অমলিন।"
সুবাসে সুবাসিত, মুখরিত এই "চির বসন্ত" হৃদয়ে
চাতক চোখের অতল চাহনিতে চেয়ে রবো অপলক।
সৌরভ ছড়িয়ে সতেজতা হারিয়ে ঝরে গেলে ফুল,
পলকের ক্লান্তিরা ছুঁয়ে গেলো এই চোখের পাতা—
কথা রাখা হলো দায়।

সুখী হবে বলে সব ছেড়ে যবে এই হাত ধরেছিলে—
কথা দিয়েছিলাম, চিরসাথী হয়ে রবো পাশাপশি।
স্বপ্নগুলো আর কেমন তোমায় আগের মতো
ছোঁয়ে যায় না তিলোত্তমা সুখে,
তাই অজস্র জীবাণুরা ধেয়ে এলে কিলবিল
তুমি যখন পালাবার পথ খোঁজ, তখন—
কথা রাখা বড় দায়।

পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম
১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ইং।

মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ
রবিন
১৮-০৪-২০১৯ ০৯:৫৫

সময় যতই কঠিন হোক না কেন, আমরা স্বপ্ন দেখে যাই, স্বপ্ন দেখাই। কথা দিই নতুন দিনের আশায়। সেই কথা রাখা নিয়ে আজকের এই নিবেদন। বন্ধুরা, যাদের হাতে সময় কম তারা পরে সময় করে পড়িও, যাদের ধৈর্য্য কম তারা আর সময় নষ্ট করিও না, আর যাদের সময় ও ধৈর্য্য আছে তাদেরকে পড়ার আমান্ত্রণ। কষ্ট করে ভালো কিংবা মন্দ লাগাটা মনখোলা মন্তব্যে জানালে কৃতার্থ হবো।