আজ ২৮ আষাঢ় ১৪২৭, সোমবার

বিপন্ন সত্তা
- সোহরাব হোসেন - নবনীতা

আজকাল পৃথিবীতে অপমৃত্যু দেখি
আয়ু যেন কমে গেছে বেমালুম
বাঁচে না কিছু আর জনম জনম।

কেন যেন ক্ষণজীবী হয়ে যায় সব
বাঁচে না কিছুই যেন বেশিদিন,
উদাসীন হয়ে যায় উচ্ছ্বাস
ক্লান্তিরা জেঁকে বসে—
যখনি শোধিতে হয় হৃদয়ের ঋণ।
ঠুনকো এ পৃথিবীতে
সবকিছু ভেঙে পড়ে কত সহজেই!
বেঁধে যায় সব সুর অযথাই
সব মায়া, সব ঘোর—কেটে যায়
এক কথাতেই কেন ভেঙে যায় ঐকতান,
প্রেমহীন এ হৃদয় কতকাল বাঁচে—হারিয়ে স্বপন!

নিজেকে হারালো সে মানুষের ভিড়ে
দিয়েছি উজার সব—হৃদয়ের উৎসব,
জগতের দুষ্প্রাপ্য ঐশ্বর্য—একে একে সবকিছু
দিয়েছি নিংড়ে,
নিতে সে পেরেছ তার কতটা!
এতো কিছু বুঝে তবু বুঝেনি সে কেন এই মনটা!

শিউলিরা ঝরে পড়ে প্রতি রাতে ঘাসের উপরে
প্রতি ভোরে শিশিরে স্নান করে
কেমন জড়িয়ে থাকে সবুজ চাদরে!
যখন ফুটে না সে, কুয়াশারা হয়ে যায় বিলীন।
ঋতু যায়—ঋতু আসে
ঘাসের বুকে ফের সফেদ শিউলি হাসে,
এই সব যাতায়াত মনকে পুড়ায়—বিরহী আগুনে।
প্রকৃতির ভালোবাসা চিরায়ত
মেতে থাকা অফুরান উৎসবে ফিরে আসে
এইখানে সবকিছু আগের মতো,
বরাবর ফিরে আসা আধিপত্য নিয়ে
আমিও চেয়েছি হতে—প্রকৃতির মতোই।

এতো পথ পাড়ি দিয়ে এতো কাছে এসেছিলো সে
কোন এক মাহেন্দ্রক্ষণে
সত্তার প্রয়োজনে খুঁজেছে আমায় সে
সঙ্গীহীন—নিঝুম দ্বীপবাসীনি।
দিয়েছি উজার সব—হৃদয়ের উৎসব,
জগতের দুষ্প্রাপ্য ঐশ্বর্য একে একে সবকিছু
দিয়েছি নিংড়ে,
জ্বেলে প্রেম তনু-মনে মত্ততায় জুড়িয়েছে প্রাণ
সঞ্জীবনী সুধা পিয়ে ছড়িয়েছে সৌরভ
হৃদয়ের আনাচে-কানাচে,
সন্দীপনে বিহ্বল, আর ছিলো হারাবার ভয়
চোখে কতো মিনতি, যেন তারে না ভুলি!
তবু তার দেখা নাই আজ,
ধরে রাখা যায়নি তার ক্রমশ নিঃশেষিত প্রয়োজন,
অগোচরে গেছে চলে রাতের মতোই সে নীরবে।

উড়ুক না প্রজাপতি রঙিন ডানায়
সীমানা প্রাচীরে তারে রাখিনি বেঁধে,
উড়ে উড়ে পিছুটানে আসে যেন ফিরে
ফুল হয়ে বিলিয়েছি শতধা
বসুক না ফিরে ওই রঙিন পাঁপড়িতে,
চেয়েছি আসুক ফিরে
শিকলে বাঁধিনি তারে—রেখেছি অবাধ
আসুক সে বারবার
তার সুখ, তার চাওয়া মনে গেঁথে বিলিয়েছি রঙ
তার ইচ্ছেডানায়,
চেয়েছি আসুক ফিরে বারবার
জড়িয়েছি তারে তবু বাঁধিনি শিকলে—
হারিয়েছি তারে এই অদ্ভুত স্ববিরোধী স্বাধীনতায়।

কেন যে ক্লান্তিরা ধেয়ে আসে
কেন যে সবকিছু ভেঙে পড়ে অবলীলায়
প্রহরীর অতন্দ্র পাহারা গলিয়ে!
অনাড়ম্বর হয়ে যায় হৃদয়ের সবিনয় নিবেদন।
বিপন্ন করে দিতে পুষে রাখা সাধ সব
কেন যে ক্লান্তিরা ধেয়ে আসে!

কেন ঘোর কেটে যায় প্রাপ্তির পর!
কিছু ঘোর থেকে যায়—তাও আবার সাময়িক,
ক্ষণিকের গণ্ডিটা পেরুবার নয়,
পেরিয়ে যদিও যায়—হয়ে থাকে দায়।
পৃথিবীটা কেন যেন ঘোরহীন মৃতবৎ সম্পর্কের ভাগাড়!
কেন যেন ক্ষণজীবী হয়ে যায় সব
বাঁচে না কিছুই যেন বেশিদিন!

হারিয়েছি শরৎ
হারিয়েছি হেমন্ত—শীত বসন্ত
হারিয়েছি অন্যমাত্রায় পৌঁছানো জগৎ,
নিঃস্ব হয়েছি আমি
ত্রিমাত্রিক জগতের চতুর্মাত্রা—সময়ের কাছে
হারিয়েছি আমার ভিন্নমাত্রিক জগৎ,
হারিয়ে সেইসব শরৎ-বসন্ত—আমি সর্বস্বান্ত।

যায় শরৎ—হেমন্ত আসে
এইসব যাতায়াতে কীবা আসে যায়!
বিমলিন হয়ে থাকা রিক্ত পৃথিবীতে এমন
নির্বাসনে বেঁচে থাকা,
মৃতপ্রায় মিছিলের একজন হয়ে
সময়ের মুমূর্ষু ধ্বংসস্তুপ মাঝে
নিজেরেই খুঁজে পাওয়া মুসিবত।

ধরে রাখা যায়নি যারে
ঘোর তবু রয়ে গেছে তার,
একবার যদি তারে পেতাম নিরলে
জেনে নিতাম তবে—
কত সহজেই এমন ভুলে থাকা যায়!
কাউকে এমন করে রেখে একা
দিব্যি কেমন করে দিন কেটে যায়!
ঘোর তবু রয়ে যায় তার,
অর্থহীন হয়ে যাওয়া পৃথিবীতে
বিস্মৃতির দরজায় মাথা ঠুকি আমি
ঘোর তবু রয়ে যায় তার,
কেন তারে ভুলে থাকা যায় না
তবু ঘোর রয়ে যায় তার,
কেন তারে ঘৃণা করা যায় না
কেন আজ আমি এত অসহায়!

স্বপ্নরঙিন দিন,
রেখে যাওয়া কাতরতা
হৃদয় গভীরে কেন বাড়ে অধীরতা!
কাঁদালো এমন করে—নশ্বর প্রেম!
পাওয়ার আশাটুকু ছেড়ে আর বেঁচে থাকা—লাগে কেমন!
জীবনের মাঝপথে, নিরর্থক হয়ে রয় সবকিছু।

কেন যেন ক্ষণজীবী হয়ে যায় সব
বাঁচে না কিছুই যেন বেশিদিন,
উদাসীন হয়ে যায় উচ্ছ্বাস
ক্লান্তিরা জেঁকে বসে—
যখনি শোধিতে হয় হৃদয়ের ঋণ।
ঠুনকো এ পৃথিবীতে
সবকিছু ভেঙে পড়ে কত সহজেই!
বেঁধে যায় সব সুর অযথাই
সব মায়া, সব ঘোর—কেটে যায়
এক কথাতেই কেন ভেঙে যায় ঐকতান!

অবাক করা যত নিয়মের বেড়াজালে
অলীক স্বপ্ন নিয়ে এই বন্দীশালায়
প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া দায়,
প্রকৃতির মতো কেন জড়ালো না সে আমায়!
রুদ্ধশ্বাস এ পৃথিবী কতদিন বাঁচে—হারিয়ে শ্রাবণ!

১৭ অক্টোবর, ২০১৯
পতেঙ্গা, চট্টগ্রাম।

মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ
সোহরাব হোসেন
০৫-১১-২০১৯ ০৮:১১

জীবনানন্দ দাস—ভালোবাসার অন্য নাম। এমনি কোন এক কার্তিকে সব ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর প্রতি উৎসর্গ করে আজকের এই কবিতা। সবাইকে পড়ার নিমন্ত্রণ।