আজ ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, শুক্রবার

বিধিলিপি
- এস আই তানভী

.
এই বাঁশের খুঁটি আর খড়ের ছাউনির ঘরটা, এই ঘরের শক্ত
তক্তার চৌকি- তার উপর খড়ের তোষক, বিছানা- বালিশ,
কাথা-কম্বল, পড়ার টেবিল- চেয়ার, হারিকেনটা- সবই আমার।
যে মা, আদরে- অনাদরে স্নান করাতো, এই তেল কালো দেহটাতে
খাঁটি সরিষার তেল মাখাতো, শাসনের চোখ রাঙ্গাতো, শার্টের বোতাম,
পেন্টের হুক লাগিয়ে দিতো, দু- বেলা ভাত তোলে দিতো প্লেটে,
চুল করে দিতো পরিপাটি- সে তো আমারই মা, কত সুখ! কত আনন্দ!
অথচ; এই সত্যের অন্তরে আরেক সত্য- এই ঘর-বাড়ি, এই বিছানা
কিছুই আমার নয়, এমনকি জন্মটাও এখানে নয়, শুধু হাত পায়ে
লকলকে বেড়ে উঠা, নিদারুণ-নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি হওয়া।
.
এই মা, আমারই মা- তবে তার গর্ভ থেকে আসা হয় নি। তাহলে?
কোথায়, কার ঘরে, কার জঠরে ছিলাম- সেই দশ মাস?
প্রসব বেদনার স্বাদ নিয়েছিলো কোন বেচারী? কোথায় তিনি?
আর কেনো আমি এখানে? যেদিন জানলাম- যা জানি তা ভুল,
সত্য উদঘাটনের অভিযাত্রায় পা বাড়ালাম- প্রবল ঝড়ে
নীড় হারা, নির্বাক, বিদিক স্রোতে ভাসা তৃষ্ণাতুর চাতকের মতো।
.
এক করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি আমি, সেসময় জন্মদাতা
পর ঘরে আশ্রিতা, তাই আতুর ঘরটাও অন্যের দেয়া আর
জন্মের কিছুকাল পরেই গর্ভধারিণীর মস্তিষ্কের বিকৃতি, তাই
পথে পথে ঘুরা, গাছতলায় রাত যাপন করা, ক্ষুদা তৃষ্ণা আর
মস্তিষ্ক রোগে ভোগা এক অভাগিনী নারী আমার জনম দুখিনী,
মা জননী (হায় রে নিয়তি), কতটা ক্ষতবিক্ষত- আমিই জানি।
.
শুরুতেই জীবন যেন বিপন্ন, স্থগিত হয়ে গেলো স্বপ্নের গতিপথ।
এর কিছুদিন পর সেই দুখিনী মা, ফিরে এলো স্বাভাবিক জীবনে
জীবন নাটকে নতুন মোড়- দুই মা, কেউ আমাকে ছাড়ে না,
তবে, যার নাড়ি ছিড়ে এসে পৃথিবী দেখেছি- তার সাথে নতুন করে,
জীবন শুরুর সিদ্ধান্ত নিলাম (যদিও মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে)।
.
এরপর গ্রাম থেকে শহরের ভাড়া বাসায়, নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ,
নতুন বন্ধু-বান্ধব, খেলার সাথী- সহপাঠী, প্রতিবেশী, রাস্তাঘাট এবং আমি।
বারবার পরিবেশগত কারণে অকারণে বাসা পরিবর্তন, কোনভাবেই
নিজেকে গোছাতে পারি না, অভাব-অনটন, মায়ের অসুখ, নিন্দুকের
নিন্দা- নিজের একটা না আছে থাকার জায়গা, না আছে ঘর, আমার
কাঁন্নার করুণ শব্দটাও আমি ছাড়া কেউ শুনতে পায় না (হায় বিধাতা)।
.
এরপর বয়স বাড়া শুরু সাথে শারীরিক পরিবর্তন, লজ্জাবোধের জন্ম;
প্রায় বাবা-মা কে রেখে কোন না কোন বন্ধুর বাসায় রাত যাপন
মাঝে মাঝে বাস স্ট্যান্ড-এ রাত জাগা কুকুরের সাথে কেটে গেছে
বহু রাত, " ছোট্ট একটা বাড়ি চাই"- বাবার কাছে চোখের জলে
শত সহস্র বার এই একটা আবেদন ছিলো, জন্মান্তরের আবেদন।
বাবা আশ্বাস দিতে কখনো ভুলেন নি, চোখের জল মুছে দিতেও।
.
তারপর নানাজি'র দেয়া এক টুকরো জমিতে ছোট একটা বাড়ি
ভাবলাম- এটাই আমার স্থায়ী বাড়ি, (নানাজি কথাও দিয়েছিলো)
এখানেই থাকবো সারাজীবন, ভালোই দিন কাটছে; অভাব থাকলেও
স্থায়ীভাবে বসবাসের জায়গা হয়েছে, একটা স্বপ্নপূরণ, লেখাপড়া
চলছে, স্কুল শেষ করে কলেজ, টিউশনিতে খরচ চলছে, পাশাপাশি
চাচা'র ওয়ার্কশপ-এ কাজ শেখায় মননিবেশ, আর সাথে আছে-
বাবার প্রাণ উজাড় করা উৎসাহ, অকৃত্রিম আদর, মমতা, ভালোবাসা।
.
কিন্তু, কিসমত-এর লেখক আমায় নিয়ে কী খেলা খেলতে চায়
আজো জানি না, কোন দিন জানতেও পারবো না নিয়তির মর্জি।
কিছুদিন যাবার পরই ঝামেলা, বাড়িটা, জায়গাটা ছাড়তে হবে
(আজো দেই নি), দিতেই হবে- অংশীদার অনেক- সবার দাবী এক।
মা আবার অসুখে, ব্রেইন টিউমার আবিষ্কার, ধীরেধীরে নিভে গেলো
দৃষ্টি, অচল সংসার সচল রাখতে অসময়ে বন্ধু-বান্ধবের সাথে
স্কুল কিংবা কলেজ মাঠের আড্ডা, ক্রিকেট-ক্যারামবোর্ড- ফুটবল,
সব ইচ্ছা, আশা- আকাঙ্ক্ষা, ভ্রমরী মন, দুরন্তপনা সব দাফন করে
বিয়ে- শাদী, আজ সাড়ে চার বছরের ফুটফুটে এক মেয়ের বাবা।
.
হায়রে ভাগ্য! জীবনে কত কী ঘটে গেল, কত যোগ-বিয়োগের খেলা!
শ্বশুরমশাই অসুস্থ, ব্লাড ক্যান্সার, চার ছেলে মেয়ে আর শ্বাশুরিকে
রেখে শান্তির ঘুমে চিরতরে বিদায় নিলেন, কারো কথা ভাবলেন না।
জীবীকার তাগিদে স্ত্রীর কাছে অসুস্থ, অন্ধ মা'কে রেখে আমি ঢাকা-
গাজীপুর, যোশর-খুলনা, গজারিয়া-মুন্সিগঞ্জ, পঞ্চগড়- ঠাকুরগাঁও-
জীবন-দৌড়টাই থামে না, আকাশী জলে ভিজে অশ্রুজলে ভাসি।

বছর তিনেক হলো- নানাজি'র জমিতে গড়া বাড়িটাতেই সাত বছর
অন্ধত্ব জীবন কাটিয়ে জীবনের চির অবসান ঘটিয়ে এখান থেকেই
মা চলে গেলো পরপারে, তাঁর শেষবেলায় পাশেও থাকতে পারি নি।
আজ বাবাও অবসরে, কত পরিবর্তন! মেয়েটাও দিনে দিনে বাড়ছে-
সেই খড়ের ছাউনির বাড়িটাতে টিন পেটানো হয়েছিলো বহু আগে,
সেটা আজ কংক্রিটের ছাদ পেটানো অত্র গ্রামের একমাত্র বাড়ি;
ঘরে কোন চৌকি নেই আছে সৌখিন খাট, খড়ের তোষকও নেই,
প্রত্যেক খাটে আছে তাঁতির কাছ থেকে বানানো কোমল তোষক,
সেই মিটমিট করে সারা রাত জ্বলে থাকা হারিকেনটাও নেই-
কোথাও খোঁজে পাই না, ঘরে ঘরে এনার্জি বাল্ব আর চার্জার লাইট;
শুধু আমার একটা বাড়ি আজো হলো না, স্বপ্নটাও ধরা দিলো না,
কোন দিন ধরা দিবে কি না জানি না, শুধু জানি দুনিয়ার বাদশা,
আমার মালিক নূর-এ এলাহি যা কিছু করে তার আপন মর্জি।
.
এক টুকরো জমি, ছোট ছোট দু-তিনটা ঘরের একটা বাড়ির স্বপ্ন
শুধু আমার একার নয়, মায়ের দাবী ছিলো, হাজার বছরের দাবী,
অবিরত আকুল আবেদন করতো, বিবাহিত জীবন- সংসারে
সে কিছুই পায় নি, অন্যের দেয়া একটুকরো জমিতে আশ্রিতা স্বামী,
একটা ঘর, ঘুমানোর জন্য একটা বাঁশের খাঁড়া, দুবেলা দুমুঠো
ভাত রাঁধতে মাটির হাড়ি-পাতিল, অভাব- অনটন, অসুখ, দীর্ঘশ্বাস
আর কিছুই নয়, এমন কি; মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটায় আর আমাকে
লালন-পালন করতে বাবা দ্বিতীয় সংসার করায়, অন্য দশ জন
স্ত্রীর মতো স্বামী- সন্তানকেও পায় নি আপন করে, হায় পোঁড়া কপালী!
.
বাবা বারবার বলতো- "এইতো, আর মাত্র ক'টা বছর, অবসরে গেলেই
সবার আগে তোর মা'কে নিয়ে যাবো মাদ্রাজ, চিকিৎসা হবে, দৃষ্টিও
ফিরে পাবে ঠিক আগেরই মতো। তারপর; একটুকরো জমি কিনে
কংক্রিটের ছাদ না হোক, টিন পেটানো একটা বাড়ি করে দিবোই,
সেখানেই থাকবি আজীবন তোর মাকে নিয়ে।" আজ বাবা অবসরে-
মা কিছু না নিয়ে বাবার আগেই চলে গেছে শুধু রোগমুক্ত হয়ে, অভাগী!
.
মা'র স্বপ্নের কথা বলে আজ লাভ নেই, কিন্তু আমার স্বপ্ন? সেটাও
ফিকে হয়ে গেছে সূর্যাস্তের মতো, সব হিসেব গড়মিল- অনেক ঋন,
শোধ দিতে হবে, বোনটাও বিবাহযোগ্য, পাত্রের খোঁজ চলছে,
ছোট ভাইটা এখনো বেকার, বাড়িটা ছাড়া কিছুই আর নেই তার,
এক ইঞ্চি জমির মূল্য এক চামুচ পারমাণবিকের সমান সমান।
ভাসমান হয়ে এ জীবন কতদূর যাবে জানি না, তবুও বুক থেকে
বের হয় না কোন দীর্ঘশ্বাস, ছোট বেলার মতো কাঁদতে চাই- পারি না।
.
শুধু মাঝেমাঝে দূরাকাশের দিকে তাকিয়ে মালিকের কাছে বলি-
"হে মাওলা, কপালে কি লিখেছো- জানি না, জানতেও চাই না,
শুধু মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, যা কিছু করো- তা আমার মঙ্গলেরই জন্য"
এবং নিশ্চয়ই আমি হতাশ নই, কেনোনা একটা বাড়ি আর মা ছাড়া
সবই এবং সবাই আছে আমার, তাছাড়া আমার থেকেও অনেক বড়
শত শত হতভাগা নানাভাবে লড়াই করে এ ধরায় বেঁচে আছে, থাকবে,
তাই, কারো বিরুদ্ধে নেই কোন মান-অভিমান, এভাবেই বাঁচবো আমিও।
বিশাল এই দুনিয়ার মালিক- নিশ্চয় কোথাও না কোথাও আমার জন্য
এক টুকরো জমিন নির্ধারণ করে রেখেছে- যা, আমি জানি না
শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র এবং জীবনের দু:সময়টা ধৈর্যের সাথে
মোকাবিলা করা আর এই কণ্টকময় পথ সাবধানতায় পাড়ি দেয়া।।
.
৩১/১২/১৬ইং
(আমার ৩০তম জন্মদিন.
উৎসর্গ:- আমার মরহুমা জনম দুখিনী, মা)

মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ
এস আই তানভী
০৭-০৪-২০২০ ২০:৩৬

মা, ভালো থেকো