আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, সোমবার

অভিশপ্ত হয়ে যাস না (খোকা)
- এস আই তানভী

.
(এক)
--------
এ ব্যথার কথা তোর বোঝার কথা নয়
যদি মেয়ে হয়ে আসতি এ ধরায়;
আর মা হবার সৌভাগ্যবতী
যদি কখনো হতে পারতি
তবে তোর জন্য লিখতাম না এই কবিতা
তুই এমনিতে বুঝতি মায়ের সব ব্যথা।।

আমারো বুঝার কথা নয় এ ব্যথার কথা
তোর বাবা হওয়ার সুবাদে ভেঙ্গেছে নিরবতা
মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙ্গে যেতো মাঝরাতে
দেখি; তোর মা শব্দহীনতায় কাঁদে।
কোন সে ব্যথায় বুক ভিজে লোনা জলে
সান্ত্বনা! দিতে পারি না তাকে কোন ছলে।

(দুই)
-------
আধঘুমন্ত চোখে বলি, 'কি হয়েছে ভাই?
চোখের জলে কেন বুক ভিজে যায়?'
বলে, 'জানো, পেটের ভিতরটা যেনো স্টেডিয়াম,
সেইখানে বাবুটা খেলে যায় অবিরাম।
ফুটবলে কিক মারে, কখনো গোলকিপার
যেনো চার মারে, ছয় মারে সেরা ক্রিকেটার।'

জানিস খোকা, একখন্ড মাংসপিণ্ড ছিলি যখন
ভয়ে কিছু খেতো না, বমি হতো যখন তখন।
পেটের ভিতর তোর ধিরে ধিরে যত বড় হতে থাকা
তোর মায়ের পথ হতো তত সাবধানতায় আঁকা।
হাঁটা চলা, উঠা বসা উহ! কত যে কষ্ট
যেনো পৃথিবীতে তার জীবনটাই দিকভ্রান্ত।।

(তিন)
--------
পেটের ভেতর তোর নড়চড়ায় হয়ে যেতো কাতর
যেনো থেকে থেকে লাথি দিতিস কলিজার উপর,
আবার যখন নড়তি না অনেক সময় একটু খানি
দুঃচিন্তায় বিভোর হতো, ছেড়ে দিতো চোখের পানি,
ফোন করে কাঁদতো শুধু, মুখে কথা ফুটতো না
পৃথিবী যেনো তার কাছে ব্যর্থতার এক বিছানা।।

এবার, তোর সময় শেষ ঐ পেটের ভিতরে থাকার
বের হতে অস্থির হয়ে করছিস তোলপাড়।
ছয় সাত দিন অসহ্য ব্যথা টেনে করলো চেষ্টা
নরমাল ডেলিভারিতে 'না' ভোট দিয়েছেন স্রষ্টা।
কয়েকজন ডাক্তার কাঁচি দিয়ে তার পেটটাকে কাটলো
তবেই না তুই আসলি বেড়িয়ে, দেখলি পৃথিবীর আলো।

(চার)
-------
হাসপাতালে সাত দিন কি যে কষ্ট হয়েছে তার
পেট কাটার আগে শরীরটা অবস করেছিলো ডাক্তার,
ধীরেধীরে অবস কাটে, জ্বালা বাড়ে, কাটাতে টান পড়ে
-'আমাকে বিষ এনে দাও' তোর নানীকে বলতো বারেবারে।
অথচ তোকে কোলে পেয়ে ব্যথার কথা মূহুর্তে গেলো ভুলে
শুকনো ঠোঁটে কোন যে জান্নাতের হাসি গেলো খেলে!

তারপর বাড়িতেও কত যে কষ্ট তার, উঠা বসা, হাটা চলা
তোকে নিয়েই জীবনের ভাবনা গুলো করে যেতো খেলা।
তোর সর্দি জ্বর হবে বলে গরম জলে তৃষ্ণা মিটাতো
বাইরের বাতাস যেনো স্পর্শ না করে, বাড়িতেই থাকতো
খোকা, তুই এই ঘুমাতি এই উঠতি রাত দিনে শতবার
তোকে নিয়েই ব্যস্ত সে, জীবনের শত কারবার।।

(পাঁচ)
-------
বুকের দুধ পান করতি যখন তখন, একটু পরপর
কচি দাঁতে বসিয়ে দিতিস যন্ত্রণাময় কঠিন কামড়,
শুধু বিষমো ব্যথায় বারবার উহ্ ইশ্ করে উঠতো
সেকেন্ড পরেই সে ব্যথা ভুলে আবার দুধ পান করাতো
আরো যে কত শত ব্যথার কথা রয়ে গেছে তার মনে
কোন সন্তান তা জানতে পারে না ভুল করেও কোন ক্ষণে।।

শুধু কী তোর মা! না রে খোকা না
পৃথিবীর সব মা সহে গেছে এমন যন্ত্রণা।
যত মা, সেই হাবিল কাবিলের জন্মের পর থেকে
এসে গেছে, সবার হৃদয়ে এ যন্ত্রণা-ব্যথা রয়েছে এঁকে।

(ছয়)
--------
যদি, কখনো মায়ের কষ্ট করতে পারতাম অনুমান
কোনদিনও করতাম না ভুলেও তার সাথে মান-অভিমান।

আমার বাবাও যদি আমাকে বুঝাতো এমন ভাবে
কখনো তিল ব্যথা দিতাম না আমার মায়ের বুকে,
আজ তোর দাদীর কবরের পাশে বোবা ভাষায়, চিৎকারে
বারবার ক্ষমা চাই আর্তনাদে, চোখের জল ছেড়ে
মা আমায় করেছে কি ক্ষমা? জানতে পারি না
পৃথিবীর এমনই নিয়ম! কোন দিন জানতেও পারবো না।

বুঝে না বুঝে মায়ের অন্তরে দিয়েছি কত ব্যথা
আজ অনুসূচনায় ছটফট করি, মনে পড়লে সেসব কথা
যেনো দোজখের আগুন অন্তর ঘরে অবিরত জ্বলে
যেনো সমগ্র পৃথিবী আজ বিপরীত ছন্দে চলে।
শোন্ খোকা শোন্, শোনে রাখ মনে প্রাণে
তোর মা যত দিন র'বে, অভাব তোর থাকবে না ত্রিভুবনে।

(সাত)
---------
সাত আসমান সমান ধন হয়ে যাবে বিফল
যদি তোর সামান্য বাক্যবাণে বের হয় তার চোখের জল,
তোর অসুখ বিসুখ, শত ঝামেলা; কাটিয়েছে কত নির্ঘুমরাত
তাই তো তার পায়ের তলেই স্রষ্টা রেখে দিয়েছেন জান্নাত।
সব ধর্মেই মায়ের মর্যাদা রয়েছে সবার উপরে
অভিশপ্ত হয়ে যাবি, তাকে রাখিস যদি একলা করে।

সে যদি তার দু হাত তুলে তোর জন্য করে দোয়া
ত্রিভুবনে তোর জীবনে কিছুই যাবে না খোয়া।
তোর-আমার, মাওলা সবার দিয়েছেন ঘোষণা
মায়ের দোয়া, বাবার দোয়া ফেরত হয়ে আসে না।
তবুও সে জনম দুঃখী, শুধু সন্তানেরই তরে
অভিশপ্ত হয়ে যাবি, তাকে রাখিস যদি একলা করে।

যদি কাঁধে করে নিয়ে চলিস তাকে শত সহস্র আলোকর্বষ
তবুও তার ঋণের একটি কণা হবে না কখনো ভস্ম।
যদি সে আপন মনে না করে ক্ষমা তোর অপরাধ
মরনের আগে শত মরনে হয়ে যাবি বরবাদ।
তাকে রাখিস আগলে, যতদিন র'বে মাটির উপরে
অভিশপ্ত হয়ে যাবি, তাকে রাখিস যদি একলা করে।।

-----------------
২২/০৩/১৮ইং - ১৯/০৪/১৮ইং
উৎসর্গ ঃ- আমার প্রিয় চার মুখ Shireen Akhter Zannatul Ferdous Rimi Alpona Opu Nishat Rahman

মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ
এস আই তানভী
১৯-০৪-২০২০ ২১:৪৮

মায়ের কষ্ট যেনো সবাই বুঝতে পারে।