আজ ২২ আষাঢ় ১৪২৭, মঙ্গলবার

মেরী
- মো. আব্দুর রাজ্জাক - মেরী

দীর্ঘাঙ্গী, মনোহরণ করা চেহারা, সুদর্শনা
অস্থির সুন্দর বক্রতায় কারুকার্যময় দেহখানি।
সরল চকচকে বিষাণের সারি, লাবণ্যে ভরপুর!
লাল গোলাপের ছোঁয়ায় আগুন উসকে দেয়া অধর!
তাঁর উপরেই বাশিঁর মতো ঝুলেপড়া নাক!
বহিৃশিখাযুক্ত তাঁর নীল চোখ জোড়া!
সুন্দর দু’টি কালো ভ্রুরেখা, ঢেউখেলানো ঘন কালো চুল।

আঙুলগুলো হালকা গোলাপী আভাযুক্ত
মুখখানার জমিন শান্ত, দৃঢ়, দীপ্তিময়ী কিন্তু দয়ার্দ্র।
পুরো রূপ জুড়ে আগুনের হলকা!
বাবা-মায়ের খুব আদরের মেয়ে
মেরী, এক পরমা সুন্দরী কন্যা।

রূপে গুণে অতুলনীয়া, লাবণ্যময়ী-চিরযৌবনা
বলতে পারো, রাজকন্যা।
জন্ম, লালিত ভাগ্য সুপ্রসন্ন তাঁর,
অভাবের অনুভূতি ছিল তাঁর অভিধানে অনুপস্থিত।

বিপত্তি ঘটলো বাইশ পেরুতে
ভালোবেসে বিয়ে করলো এক যন্ত্রমানবকে
যে শুধু নিয়ন্ত্রণ করতে জানে, বুঝতে শিখে নাই।
সেই থেকে জীবনটা ভার হয়ে আছে ওর।
অল্প দিনে কর্পূরের মতো উবে গেল সব সুখ!
তাঁরা দু’জন হয়ে গেল নদীখাত!
মাঝখানে বয়ে চলেছে নদী, জীবনধারা।

তাঁরা এতা দিনে বুঝে গেছে
অন্ধকারে পরিচয়, অন্ধকারে প্রণয়
অন্ধকারে বয়ে চলা তাঁদের জীবন।
তাঁরা চিনতে পারেনি, মিলন হয়নি কোনো দিন।

চারপাশে, নেই নেই ফিসফিসানির শব্দ
বাড়িতে আরো জোড়ে জোড়ে কোরাস জুড়লো!
কর্কশ আওয়াজ,
ভুতুরে ফিসফিসানি।
কখনো সুরের মূর্ছনায় উঠছে ঝংকার
আরও টাকা চাই, আরো টাকা চাই।
সারা বাড়িময় ফিসফিসানি
অভাবের ফিসফিসানি, নেই কিছু নেই।

সময় বেশ গড়িয়েছে
বাচ্চাগুলো বুঝেগেছে মায়ের বেসুর ভালোবাসার খোঁজ,
কনকনে ঠান্ডা চোখে বাচ্চা তিনটে চেয়ে থাকে অপলক
বারবার মায়ের লুকোচুরি খুঁজতে থাকে ওরা।
মাঝেমাঝে ধরা পড়ে যাচ্ছে, মেরী
ত্রুটি ঢাকবার চেষ্টাও করে ও।

এক সময় বাচ্চাগুলোকে ভালোবাসতে লাগলো সে
কিন্তু হৃদয়ের গভীরে কঠিন স্তরে স্নেহ,
মমতা অনুভূত হয় না তাঁর।
একটু সতর্ক দৃষ্টি দিলেই বোঝা যায়
কিসের যেন দেয়াল তোলা।

বড় ছেলে কিছুটা বুঝে নিতে চায় বেদনার ভাগ
সেও শুনতে পায় সারা বাড়ির ফিসফিসানির কোরাস!
নেই! নেই! কোথাও কিছু নেই!
আছে শুধু পাওনাদারদের তাগাদা!
প্রতি ভোরে দড়জায় দু’চারটে টোকা দিয়ে যায় তাঁরা।

স্বামীর ভাগ্যটা অতোটা খোলতাই নয়
জীবনটা স্রেফ না দিয়ে ভরা।

মেরী ছেলেদের বোঝায়-
বড়লোক হয়ে জন্মানোর চেয়ে
ভাগ্য নিয়ে জন্মানো অনেক ভালো।
বড়লোকের হারাবার ভয় থাকে,
ভাগ্য নিয়ে জন্মালে অনবরত পেতেই থাকবে,
হারাবার ভয় নেই।

গুণগুলোরই নাকি ক্ষমার দরকার হয় বেশি!
মেরীর জন্যও তাই!
আর এই জন্যই এমন মানুষের সাথে সংসার!
যে পুরুষ কখনো বাঁচার মতো বাঁচতে শিখেনি
নিজেকে ভালোই বাসেনি।
যিনি ভালোবাসতেন ক্ষমতা।
অদ্ভুত এক ক্ষমতা,
অপরের জীবন শক্তি শোষণ করে বাঁচার ক্ষমতা!
জীবনের সার অংশটুকু শুষে নেন
এমন পুরুষ লোকটা।

মেরীর প্রতি রাতে ডুবে যেতে দেখছে চারপাশ
আর; ফিসফিসানির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে বাড়ির।
মেরীর বুঝতে বাকী নেই-
সুখ হাজার বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জন্মায়,
অথবা অদৃষ্টের দানে নাজিল হয়।

বেদনাময় নিষ্ফলতা অভিজ্ঞতার অভাবমাত্র।
হাজার বছরের অভিজ্ঞতার তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখা যায়
জীবনব্যাপী আরো কঠিন ফিসফিসানির শব্দ
যার ইতিহাস সমাধি পর্যন্ত বিস্তৃত।


(রচনার তারিখ: ১৯/০৫/২০১৯খ্রি.)

মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ
ফয়জুল মহী
৩০-০৬-২০২০ ১৩:৪৩

মনোরম