বাতাশির স্মৃতি কথা ৩১ আগস্ট ১৯৯৬
- ফয়েজ উল্লাহ রবি

জানবে কি চাও আমি যে কে? আমার কথাগুলো-
তবে বলি শোন-
নাম যে আমার বাতাশি, শতো দুঃখেও হাসি।
বয়স আমার মা বলেছে এগারো কিবা বারো, যখন স্কুলে পড়ি,
জন্ম তারিখ লিখতে গিয়ে স্যার লিখেছেন এক এক বিরাশি।
গ্রামের মেয়ে সাধারণ এক লেখাপড়া করতে আমি চাই,
পাড়ার চাচী-জেঠি মাসীদের এক কথা
“মেয়ে লেখাপড়া শিখে কি করবে ঘরের কাজই তো করতে হবে,
ভাত পাকানো বাচ্ছা-কাচ্ছা লালন পালন”
মাও তাদের কথায় সায় দিয়ে দিল।
কিন্তু বাপ জান আমার তা মানলো না বাবা বললো-
“মা তোর যা ইচ্ছে লেখা-পড়া করবি আমি আছি তোর পাশে বট বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে”
বাবার সেই কথা গুলো আজো বড় মনে পড়ে।

সেই দিনটির কথা ভুলবো না, শুক্রবার ছিলো আমিন কাকা এসে মাকে ডাকিতেছে “কই গেলা গো বাতাশির মা, বাতাশির বাপ হে যে বেন বেলায় ক্ষেতে গেলো কোন খবর-টবর নিছনি? জুম্মার নামাজের টাইম হইছে, কাম-কাম কইরা কি নামাজের কথা ভুইলা গেছে একটু খবর নাও”
মা আমায় ডেকে বললো “বাতাশি যা তো মা দেইখা আয় তোর বাপ কি করে”?
বাড়ীর পাশেই ধানের ক্ষেতের আইল ধরে চলছি আমি, দূর থেকে দেখা যাচ্ছে বাবা ক্ষেতের আইলে শুয়ে আছে। পাশে গিয়ে “বাবা উঠো নামাজের সময় হয়েছে চলো বাড়ী চলো”।
আমার কথা আর বাবার কানে পৌছেনি অনেক জোড়ে-জোড়ে ডাকলাম আর বাবা উঠলো না সেই যে ক্ষেতেই আইলে ঘুমিয়ে গেলো। পাশের ক্ষেত থেকে দুই জন এসে বললো “তোর বাপ তো মইরা গেছে”। সেই যে ক্ষেতের আইলেই শুয়ে গেলো বাবা উঠলো আর না জেগে কোন দিনও কোন ক্ষণে।
আমার আর বাবাকে পাশে বসে কবিতা শোনানো হলো না
দুই দিন আগে শুনতে চেয়ে ছিলো “মা কি শিখেছিস ইস্কুলে
শোনা তো মা” আমি শোনাব এই- বাবা উঠে গেল “পরে শুনবো বলে”
এক বছর হয়ে গেছে বাবা আর ফিরে আসলো না, সেই দিন সকালে মা বললো- “বাতাশি আজ ইস্কুলে যাইস না, মেহমান আসবে তোরে দেখতে”
আমাকে দেখার আর কি আছে মা?
“এতো কথা কইছ না তো, যা কইছি তা শোন”
পাশের বাড়ীর শিমুল ভাই এসে বললো- “তুই চইল্লা যাবি আমাগোরে কি ভুইল্লা যাবি”
কেনো যে শিমুল ভাই এই কথা বললো বুঝতে পারিনি কিন্তু বুকটা যেন ফেঁটে যাচ্ছিল করুণ এই কথার সুরে। এই ভাবে কেনো যে বললো?
দুইটা কলা গাছ বাড়ীর সামনে ছোট কাকা লাগালো তাতে আবার কাগজের ফুল লাগিয়ে দিলো, মা কতো কি রান্না করতেছে পোলাও এর মুহু-মুহু গন্ধ প্রাণটা জুড়িয়ে যাচ্ছে যেনো, বাড়ীর ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে গুলো কাগজ চিড়ে ফেলবে তাই আমি-ই পাহারা দিচ্ছিলাম।
অনেক মেহমান আসলো, খাওয়া দাওয়া শেষে মসজিদের হুজুর এসে কয়েক জনের নাম বললো সাথে আমার নাম ও বাবার নাম বলে বললো “মা বাতাশি কবুল বলো” কবুল এর মানে বুঝতে পারিনি, সবাই বললো “বল কবুল বল” আর কি; কবুল বলে ফেললাম। সন্ধ্যার আগেই ভ্যানে উঠিয়ে দিলো মা কাকারা মিলে কোথায় যাচ্ছিলাম কার সাথে যাচ্ছিলাম বুঝার আগেই সকাল হয়ে যায় কিন্তু জীবনের সকাল আর দেখা হয়নি, এই আমার বাড়ী এই আমার ঠিকানা, তা বুঝে উঠার আগেই দুই সন্তানের মা। আজও আমার মতো অনেক বাতাশিরা রোজ হারিয়ে যাচ্ছে, জীবন থেকে জীবনে মিলিয়ে যায় কোন অজানা আঁধারে।।

মঙ্গলবার, দাম্মাম, সৌদিআরব
০৩ শ্রাবণ ১৪২৪, ১৮ জুলাই ২০১৭


২৩-০৬-২০২৪
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।