প্রিয় হুজুর এবং আমি -১৮তম অংশ
- মোমেন চৌধুরী
জীবন যেন ধাপে ধাপে পরীক্ষা নিচ্ছে। আমি ভালো হতে চাই, কিন্তু চারপাশের মানুষ সেটাকে সহজ করে দিচ্ছে না। কেউ হাসে, কেউ কটূক্তি করে, আবার কেউ চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করে। তবে আমি জানি, সত্যের পথে থাকলে একদিন এদের অনেকেই আমার পরিবর্তন বুঝবে…
অপমানের আরেকটি ধাক্কা
সেদিন মাদ্রাসা থেকে ফেরার সময় এক পরিচিত বড় ভাই আমাকে ডেকে বললেন—
— "এই যে মোমেন, তোর এই ধার্মিক সাজাটা বেশ ভালো জমছে! নতুন কোনো ওয়াজ মাহফিলে নাম লেখালি নাকি?"
আমি কিছু বললাম না।
তিনি আবার বললেন, "আগে তো এত ভালো ছিলি! আমাদের সঙ্গে আড্ডা মারতি, হাসতিস, মজা করতি। এখন দেখলে মনে হয়, তুই আর আমাদের মতোই না!"
আমি মাথা নিচু করে বললাম, "আমি খারাপ কিছু বলছি না, শুধু ভালো হতে চাইছি।"
তিনি ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন, "আচ্ছা, এই ভালো মানুষ সাজার নাটক আর কতদিন চলবে?"
আমি এবার মৃদু হাসলাম, "ভাই, নাটক তো মানুষকে দেখানোর জন্য করা হয়, আর আমি তো আল্লাহর জন্য বদলাচ্ছি। তাই এটা কোনো নাটক না, বরং আমার সত্যিকারের পরিবর্তন।"
তিনি কিছু বললেন না, শুধু আমাকে একটুক্ষণ তাকিয়ে দেখলেন, তারপর ধীরে ধীরে চলে গেলেন।
আমি ভাবলাম, "মানুষের কথায় যদি ভেঙে পড়ি, তাহলে কি সত্যিই বদলাতে পারবো?"
হুজুরের নতুন শিক্ষা
সন্ধ্যায় মাদ্রাসায় গিয়ে হুজুরের কাছে বসলাম। আজ আর কিছু বললাম না, শুধু চুপচাপ বসে রইলাম।
হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মোমেন, আজ মন খারাপ?"
আমি ধীরে ধীরে বললাম, "হুজুর, মানুষ কেন এভাবে অপমান করে? আমি তো কাউকে কিছু বলছি না, শুধু নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করছি। তাহলে তারা আমাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না কেন?"
হুজুর মৃদু হাসলেন, "কারণ সত্য সবসময়ই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।"
আমি বিস্মিত হয়ে তাকালাম।
তিনি বললেন, "দেখো, যখন তুমি ভুল পথে ছিলে, তখন কেউ কিছু বলেনি। কারণ তারা জানত, তুমি তাদেরই একজন। কিন্তু যখন তুমি বদলাতে শুরু করলে, তখন তারা ভয় পেল— যদি তুমিই ঠিক হও, তাহলে তারাও তো ভুল! আর এই ভয় থেকেই তারা তোমাকে থামাতে চায়।"
আমি গভীরভাবে ভাবতে লাগলাম। সত্যিই তো! আমি যখন তাদের মতো ছিলাম, তখন কেউ কিছু বলেনি। এখন আমি ভালো হতে চাইছি, তাই তাদের কষ্ট হচ্ছে।
হুজুর আবার বললেন, "মোমেন, মনে রেখো, নবিজি (সা.)-কে মক্কার লোকেরা শুধু উপহাসই করেনি, তাকে মেরে ফেলতে পর্যন্ত চেয়েছিল। কিন্তু তিনি কি তার পথ ছেড়েছিলেন?"
আমি মাথা নাড়লাম, "না, তিনি ধৈর্য ধরেছিলেন।"
হুজুর বললেন, "তুমিও ধৈর্য ধরো। মনে রেখো, যখন তুমি সত্যের পথে এগোবে, তখন বাধা আসবেই। কিন্তু আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।"
একটি অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন
পরদিন দুপুরে রাস্তায় হাঁটছিলাম। হঠাৎ সেই বড় ভাই, যিনি আমাকে অপমান করেছিলেন, এসে বললেন—
— "তোর সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "জি, বলুন।"
তিনি একটু ইতস্তত করে বললেন, "আসলে তোকে নিয়ে মজা করলেও, তোর বদলানো দেখে মাঝে মাঝে ভাবি… আমিও কি বদলাতে পারবো?"
আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম!
তিনি বললেন, "তোর মতো হতে পারবো কি না জানি না, কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়, আমারও জীবনে একটা পরিবর্তন দরকার…"
আমি মনে মনে আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম।
সেদিন রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম,
"হে আল্লাহ, আমাকে এমন একজন বানাও, যার পরিবর্তন দেখে অন্যরাও তোমার দিকে ফিরে আসে…"
একটা অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করলাম। মনে হলো, আমি সত্যিই আল্লাহর পথে এগিয়ে যাচ্ছি…
চলবে…
১১-০২-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।