প্রিয় হুজুর এবং আমি -২৩তম অংশ
- মোমেন চৌধুরী
পরিবর্তনের পথ কাঁটার মতো
পরদিন সকালে বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। আমি ওর চোখেমুখে একটা দ্বিধা দেখতে পেলাম। মনে হচ্ছিল, সে রাতে খুব ভাবনার মধ্যে ছিল।
আমি হাসলাম, "কী খবর? কেমন লাগছে পরিবর্তনের পথ?"
সে একটা ক্লান্ত হাসি দিল, "মিশ্র অনুভূতি। কখনো ভালো লাগছে, কখনো আবার মনে হচ্ছে, আমি কি সত্যিই পারবো?"
আমি বললাম, "এটাই স্বাভাবিক। পরিবর্তনের পথ কখনো মসৃণ হয় না। একদিকে নিজের ভেতরের যুদ্ধ, অন্যদিকে বাইরের মানুষের কথা— এই দুই দিকেই লড়তে হয়।"
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, "মানুষের কথাগুলো সত্যিই কষ্ট দেয়, মোমেন। আমার কিছু বন্ধু এতদিনের সম্পর্ক ভুলে আমাকে উপহাস করছে। একজন তো বলল, 'তুই এসব করে বেশিদিন টিকবি না!' শুনে খারাপ লাগল…"
আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম, "এই দুনিয়ায় ভালো কিছু করতে গেলে মানুষ হাসবেই। নবীজি (সা.) যখন সত্যের দাওয়াত দিয়েছিলেন, তখন তাকে মিথ্যাবাদী, জাদুকর, পাগল— কত কিছু বলা হয়েছিল! আমরা তো তার তুলনায় কিছুই নই।"
সে একটু ভেবে বলল, "সত্যিই… নবীজির মতো মানুষকেও যদি এভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়, তাহলে আমরা কেন আশাই করি যে সবাই আমাদের প্রশংসা করবে?"
আমি হাসলাম, "বুঝতে পেরেছিস!"
নামাজের ডাক।
সেদিন বিকেলে আমি যখন মাদ্রাসায় যাচ্ছিলাম, দেখি সে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হলো, ওর মনে দ্বিধা কাজ করছে।
আমি কাছে গিয়ে বললাম, "কি রে, মাদ্রাসায় যাবি না?"
সে একটু ইতস্তত করল, "ভাবছিলাম… আজ না গেলে কেমন হয়?"
আমি মৃদু হাসলাম, "একদিন না গেলে কিছুই হবে না, তাই না?"
সে মাথা নিচু করল। আমি জানতাম, তার মধ্যে একটা লড়াই চলছে। পুরনো জীবন আর নতুন জীবনের টানাপোড়েন।
আমি বললাম, "তুই যদি আজ পেছনে ফিরিস, কাল আবার পেছনে ফিরতে মন চাইবে। প্রতিদিন তোর সামনে একটা নতুন যুদ্ধ থাকবে— জিতবি, না হারবি?"
সে একটু ভেবে বলল, "চল, যাই!"
আমি মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম।
মাদ্রাসায় পৌঁছে দেখি, হুজুর আজ ‘সবর’ নিয়ে আলোচনা করছেন।
তিনি বলছিলেন, "সত্যের পথে চলতে গেলে ধৈর্য ধরতে হয়। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন— ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধরো, প্রতিযোগিতায় ধৈর্যশীল হও, এবং সীমান্ত পাহারা দাও, এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সূরা আলে ইমরান: ২০০)"
বন্ধুটি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। আমি বুঝতে পারলাম, আজকের এই দারস তার জন্যই যেন ছিল।
দারস শেষে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "সত্যের পথে ধৈর্য লাগবে, তাই না?"
আমি মাথা নাড়লাম, "অবশ্যই। ধৈর্য ছাড়া কেউ সত্যের পথে টিকে থাকতে পারে না।"
সে চিন্তিত মুখে বলল, "আমি চেষ্টা করবো, মোমেন। তবে মাঝে মাঝে ভয় লাগে…"
আমি বললাম, "ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু মনে রাখ, আল্লাহ কখনো তাঁর পথে চলতে চাওয়া মানুষকে একা ছেড়ে দেন না।"
সে মৃদু হাসল, "তাহলে আমিও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখছি!"
আমি মনে মনে ভাবলাম, পরিবর্তনের বাতাস বইতে শুরু করেছে।
পরীক্ষার মুহূর্ত
পরিবর্তনের পথে যাত্রা সহজ নয়, এবং বন্ধুর জন্যও সহজ হলো না।
কয়েকদিন পর সে এল কিছুটা চিন্তিত মুখে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কি হয়েছে?"
সে বলল, "বাসায় সবাই জানে আমি নামাজ পড়ছি, বদলানোর চেষ্টা করছি। বাবা কিছু বলেননি, তবে মা চিন্তিত। তিনি বললেন, 'তুই তো আগে এমন ছিলি না, হঠাৎ এত পরিবর্তন কেন? কারো প্রভাব পড়েছে নাকি?' আমি বললাম, 'না মা, শুধু নিজের মন থেকেই করছি।' মা বললেন, 'ভালো জিনিস করছিস, তবে অতিরিক্ত যেন না হয়…'"
আমি মাথা নেড়ে বললাম, "এটাই স্বাভাবিক। পরিবার শুরুতে বুঝতে পারে না, কারণ তারা তো তোকে আগের মতোই দেখে এসেছে। তারা ভাববে, হঠাৎ এ পরিবর্তন কেন? কেমন হবে? তুই শুধু ধৈর্য ধর, তোর আচার-আচরণ দেখেই তারা একদিন বুঝবে যে তুই সঠিক পথেই আছিস।"
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, "আশা করি তাই…"
আমি হাসলাম, "আল্লাহ তোর পথ সহজ করে দেবেন, ইনশাআল্লাহ।"
রাতে একান্তে
সেই রাতে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করলাম—
"হে আল্লাহ, আমি তো শুধু নিজের জন্য বদলাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে অন্যদের জন্যও এক পথের দিশা বানিয়ে দিচ্ছো। আমাকে দৃঢ় রাখো, আমাকে আরও মানুষের জন্য আলো বানাও।"
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। বন্ধুর মেসেজ—
"মোমেন, জানিস? আজ রাতে মা আমার পাশে এসে বসলেন। বললেন, ‘তুই যা করছিস, যদি সত্যিই ভালো হয়, তাহলে কর। শুধু আমাদের ভুলে যাস না।’ আমি বুঝতে পারলাম, মা আমাকে বোঝার চেষ্টা করছেন। জানি না, আল্লাহ আমার জন্য কী রেখেছেন, কিন্তু আমি সত্যিই বদলাতে চাই…!"
আমি মেসেজ পড়ে মৃদু হেসে বললাম, "আলহামদুলিল্লাহ!"
বন্ধুর বদলানোর পথ এখনো শেষ হয়নি, বরং এটা কেবল শুরু…!
১৭-০২-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।