প্রিয় হুজুর এবং আমি -২৪তম অংশ
- মোমেন চৌধুরী

পরীক্ষার আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা

পরিবর্তনের পথে বন্ধুর আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল, কিন্তু তার জন্য আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছিল।

একদিন দুপুরে সে আমাকে দেখতে এল। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। আমি বুঝলাম, কিছু একটা ঘটেছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, "কী হয়েছে?"

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, "মোমেন, বাসায় খুব ঝামেলা হয়েছে।"

আমি চুপ করে থাকলাম। কারণ জানার জন্য ওর মুখ থেকে শোনা দরকার ছিল।

সে বলল, "আজ দুপুরে বাবা রেগে গিয়ে বললেন, 'তুই কী করছিস? হুজুর হবি? নামাজ, মাদ্রাসা এসব তোদের জন্য না। তোকে আমরা এত কষ্ট করে মানুষ করেছি, আর তুই এসব করতে গিয়ে আমাদের মুখ কালো করছিস?' আমি কিছু বলতে পারিনি… শুধু মাথা নিচু করে ছিলাম।"

আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। তারপর বললাম, "তারপর?"

সে বলল, "বাবা বললেন, 'তোকে আমরা আধুনিক মানুষ বানাতে চাই, তুই কেমন পীর-ফকিরদের মতো চলাফেরা করছিস? এই পরিবারে এসব চলবে না!' আমি শুধু বললাম, ‘বাবা, আমি বদলাচ্ছি, কিন্তু খারাপ পথে যাচ্ছি না।’ বাবা বললেন, ‘এসব ঠিক কর, না হলে ভুলে যা আমাদের!’"

আমি চুপ করে গেলাম। আমি জানতাম, এটা সহজ সময় নয়।

আমি বললাম, "কী ভাবছিস?"

সে মৃদু হেসে বলল, "আমি জানি না, মোমেন। শুধু মনে হচ্ছে, আমি যদি সত্যের পথে থাকি, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ আমার পথ খুলে দেবেন। কিন্তু নিজের পরিবারের বিরোধিতা… এটা অনেক কষ্টের…"

আমি বললাম, "এটাই তো সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নবীজিকেও তাঁর পরিবার, তাঁর আত্মীয়রা কষ্ট দিয়েছে, তাঁকে ত্যাগ করতে বলেছে। কিন্তু তিনি সত্যের পথ ছাড়েননি। তোরও ধৈর্য ধরতে হবে।"

সে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, "তাহলে কী করব?"

আমি বললাম, "তুই শুধু ধৈর্য ধর, আর আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ। পরিবার একদিন বুঝবে। তবে তুই যেন কখনো তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করিস। ওদের ভালোবাসা দে, ধৈর্য দে, আর আল্লাহর কাছে দোয়া কর।"

সে মাথা নাড়ল। তার চোখে দুঃখ ছিল, কিন্তু তার মনোবল নড়েনি।

হুজুরের উপদেশ

সেদিন সন্ধ্যায় আমরা মাদ্রাসায় গেলাম। বন্ধুর চোখেমুখে চিন্তা আর দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ছিল।

হুজুর আমাদের দেখে হাসলেন, "মোমেন, তোমার বন্ধুর চোখে চিন্তার ছাপ দেখছি। কী হয়েছে?"

বন্ধু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, "হুজুর, আমি বদলানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু আমার পরিবার বুঝতে চাইছে না। তারা বলছে, আমি এসব ছেড়ে দেই, নাহলে আমাকে ত্যাগ করবে…"

হুজুর গভীরভাবে তার কথা শুনলেন। তারপর বললেন, "বেটা, সত্যের পথে চলতে গেলে পরীক্ষা আসবেই। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি মনে করো, তোমরা বলবে "আমরা ঈমান এনেছি", আর তোমাদের পরীক্ষা করা হবে না?’ (সূরা আনকাবুত: ২)"

বন্ধু চুপ করে রইল।

হুজুর আবার বললেন, "বদলানোর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় নিজের পরিবার থেকে। কিন্তু মনে রাখো, আল্লাহ তাঁর পথে চলতে চাওয়া কাউকে কখনো ছেড়ে দেন না। তুমি শুধু ধৈর্য ধরো, অভদ্র হইও না, আর দোয়া করো। একদিন তাদের মন নরম হবেই।"**

বন্ধু আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল, "আশা করি, ইনশাআল্লাহ…"

অন্যরকম রাত

সেই রাতে বন্ধুর মেসেজ পেলাম।

"মোমেন, জানিস? আজ রাতে মা আমার ঘরে এসে বললেন, ‘তোর বাবা রাগ করলেও তুই তোর পথ থেকে সরিস না। আল্লাহ যদি চান, একদিন সবাই তোকে বুঝবে। শুধু আমাদের জন্য দোয়া করিস।’ আমি চমকে গেলাম! মা কখনো এমন কথা বলেননি…"

আমি মেসেজ পড়ে গভীরভাবে শ্বাস নিলাম। আল্লাহ সত্যিই তাঁর বান্দার পথ সহজ করে দেন।

আমি উত্তর দিলাম, "আলহামদুলিল্লাহ! তুই শুধু ধৈর্য ধর, একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে!"

বন্ধু লিখল, "ইনশাআল্লাহ, মোমেন! আমি জানি, সত্যের পথে হাঁটতে কষ্ট হবে, কিন্তু আমি আর পিছু ফিরব না!"

আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম, "হে আল্লাহ, তুমি আমাদের সবাইকে সত্যের পথে দৃঢ় রাখো…"

বন্ধুর বদলানোর পথ কঠিন, কিন্তু সে এখনো থামেনি। কারণ সত্যের আলো একবার জ্বলে উঠলে, তাকে আর নেভানো যায় না…!

চলবে....


১৭-০২-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।