গদ্য মৃত্যু - ২
- মোমেন চৌধুরী

মোমেন দাঁড়িয়ে আছে কবরস্থানের ভেতর,
চারপাশে অগণিত সমাধি, প্রতিটির নিচে কেউ না কেউ ঘুমিয়ে আছে,
কিন্তু এই ঘুম কি শান্তির?
নাকি মাটির ভারে চাপা পড়ে থাকা এক অব্যক্ত আর্তনাদ?

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
একজন মানুষ কতবার দোয়া করেছে, আর কতবার শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালন করেছে,
তা কি মৃতরা বোঝে?
সে জানে না।

তার সামনে এক বৃদ্ধা বসে কাঁদছে।
হাত ভরে ফুল এনেছে, যত্ন করে রাখছে সমাধির ওপর।
মোমেন কিছুক্ষণ দেখল, তারপর ধীরে ধীরে কাছে গেল।

“আম্মা, আপনি কি জানেন, এই ফুলের সুবাস পৌঁছায় না নিচে?”

বৃদ্ধা চোখ মুছল, ধীরে বলল, “আমি জানি না বাবা, শুধু মনে হয়, আমি যদি সাজিয়ে দেই, তবে সে বুঝবে আমি ভুলিনি।”

মোমেন নরম কণ্ঠে বলল, “আপনার দোয়া, আপনার ভালোবাসা, আপনার সৎ কাজ—এই জিনিসগুলোই ওর কাছে পৌঁছাবে, ফুল নয়।”

বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখে এক ঝলক প্রশ্ন—যেন এতদিনকার বিশ্বাস আজ টলে গেছে।
তারপর আস্তে করে হাত রাখল মোমেনের কাঁধে।

“বাবা, তুমি ঠিক বললে। আমি আজ থেকে ফুলের বদলে দোয়া করব। আর তার নামে কিছু গরীবকে খাওয়াবো।”

মোমেন হালকা হেসে বলল, “এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা, আম্মা।"

সেদিন সন্ধ্যায় মোমেন কবরস্থান থেকে বেরিয়ে এলো।
শহরের বাতাসে ধূপের গন্ধ, ফুলের দোকানগুলোতে ভিড়,
কিন্তু তার মনে হচ্ছিল—
এত সাজানোর চেয়ে, এত আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে,
একটি নিঃস্ব মানুষের হাসিই অনেক দামি।

সে আকাশের দিকে তাকাল, মনে মনে বলল—
“হে আল্লাহ, মৃতদের কষ্ট দিও না, ওদের শান্তি দিও।
আর আমাদেরও বোঝার ক্ষমতা দাও,
যেন আমরা ভালোবাসার ভুল পথ বেছে না নিই।”

কবরস্থান থেকে বেরিয়ে আসার পর মোমেনের মনে এক ধরনের শূন্যতা কাজ করছিল।
জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে যে অদৃশ্য ব্যবধান, তা যেন আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার কাছে।

রাস্তায় নেমে হাঁটছিল সে, অন্ধকার ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছিল শহরের বুকে।
রাস্তার পাশে এক মেয়ে বসে ছিল, মাথা নিচু করে, হাতের আঙুল দিয়ে মাটি আঁকড়ে ধরেছিল—
যেন কিছু একটা হারিয়ে গেছে তার, যা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

মোমেন কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল,
অন্য সময় হলে হয়তো চলে যেত,
কিন্তু আজকের দিনটা আলাদা, আজ তার মন ভারী,
আজ সে কিছু একটা অনুভব করতে চায়,
কিংবা কাউকে অনুভব করাতে চায়, যে বোঝে এই হারানোর কষ্ট।

সে এগিয়ে গিয়ে বলল, “তুমি কি ঠিক আছো?”

মেয়েটি ধীরে মুখ তুলল, তার চোখে এক ধরনের ঝাপসা বিষাদ—
যে চোখ বলে দেয়, সে অনেক কিছু হারিয়েছে,
যে চোখ বলে দেয়, তার হৃদয়ের ভেতরেও এক শ্মশান বাস করছে।

“তুমি কে?” মেয়েটির কণ্ঠ কাঁপছিল,
তারপর নিজেই বলে উঠল, “আমার পরিচয় জানতে চাও? আমি—একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষ।”

মোমেন অবাক হলো, যেন এই কথাগুলো তার নিজের মন থেকে বেরিয়ে এসেছে।
সে নরম কণ্ঠে বলল, “হারিয়ে গেলে কি খুঁজে পাওয়া যায় না?”

মেয়েটি একরকম তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“সবাই ভাবে খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু সত্যি বলতে, কিছু মানুষ হারিয়ে যায় চিরতরে।”

মোমেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, “তাহলে চলো, আমরা একসঙ্গে খুঁজি।”

মেয়েটির চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময়, তারপর একটু নরম কণ্ঠে বলল,
“তুমি কেন খুঁজবে?”

মোমেন হাসল, “কারণ আমিও হারিয়ে গেছি।”

মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর বলল, “আমার নাম অধরা।”

মোমেন চমকে গেল।
অধরা—যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, যে ধরা দেয় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।

তারপর থেকে ওদের দেখা হতে লাগল প্রায়ই।
কখনো পুরোনো রাস্তায়, কখনো নদীর ধারে,
কখনো কোনো নির্জন পার্কে বসে,
ওরা দু’জন কথা বলত জীবন নিয়ে, মৃত্যু নিয়ে, হারিয়ে যাওয়া নিয়ে।

একদিন অধরা মোমেনকে বলল,
“জানো, আমি কখনো কাউকে আমার কষ্টগুলো খুলে বলিনি,
কিন্তু তোমার কাছে বলতে ইচ্ছে করে।”

মোমেন গভীর চোখে তাকাল,
আধো আলোয় সে দেখল মেয়েটির চোখে জমে থাকা দীর্ঘদিনের কান্না।
সে বলল, “আমি শুনছি। আমি বুঝতে চাই।”

সেই রাত, সেই নদীর ধারে, সেই বাতাসে ওরা দু’জন একে অপরকে খুলে দিল,
নিজেদের শূন্যতা, নিজেদের না বলা কথা, নিজেদের কষ্টের ইতিহাস।

তখনো কেউ কাউকে ভালোবাসার কথা বলেনি,
কিন্তু ওরা জানত—
ওদের ভালোবাসা শুধু শব্দ নয়,
ওটা এক ধরনের বোঝাপড়া,
এক ধরনের মায়া,
যেখানে দুইটা হারিয়ে যাওয়া মানুষ একে অপরের মধ্যে নিজেদের খুঁজে পাচ্ছে।

সেদিন রাতের শেষ প্রহরে অধরা বলল,
“মোমেন, তুমি কি জানো, কোনো কোনো ভালোবাসা কখনো প্রকাশিত হয় না,
তবুও সেটাই সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা?”

মোমেন ধীরে মাথা নাড়ল, বলল, “হয়তো আমাদের ভালোবাসা তেমনই।”

অধরা হেসে বলল, “হয়তো।”

সেদিন প্রথমবার মোমেন অনুভব করল—
কোনো কোনো ভালোবাসার কোনো পরিণতি দরকার হয় না,
কারণ কিছু সম্পর্কের সৌন্দর্যই হলো,
সেগুলো অসম্পূর্ণ থেকে গেলেও তারা চিরকাল বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীরে।


০৭-০৩-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।