গদ্য মৃত্যু - ৩
- মোমেন চৌধুরী

মোমেন চোখ মেলে তাকাল। পৃথিবী যেন আজ অন্যরকম ঠেকছে। এক ধরনের শূন্যতা, এক ধরনের অদৃশ্য হাত এসে বুক চেপে ধরছে। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, যেন কোথাও একটা অদৃশ্য দরজা খুলে গেছে, যেখানে সময়ের কোনো নিয়ম নেই, ব্যস্ততার কোনো ছায়া নেই, শুধু শূন্যতার রাজত্ব।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখ ফ্যাকাসে লাগছে, যেন তারা কেবল ছায়া—খুব দ্রুত হারিয়ে যাবে হাওয়ায়। এই শহরের প্রতিটি ধুলো কণা, প্রতিটি বিলবোর্ড, প্রতিটি চায়ের দোকান—সবকিছুই একসময় হারিয়ে যাবে। সময়ের সাথে মিলিয়ে যাবে ধুলো হয়ে। কিন্তু সে? মোমেন কি হারিয়ে যাবে?

একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে। "মানুষ কি আসলেই বেঁচে থাকে?"

ঠিক তখনই সে শুনতে পায় একটা মৃদু কণ্ঠ—কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছে।

সে ফিরে তাকায়।

অধরা দাঁড়িয়ে আছে কয়েক হাত দূরে। মেয়েটির চোখে এক ধরনের অদ্ভুত বিষাদ লেগে আছে, যেন সে অনেক কিছু জানে, কিন্তু বলবে না। যেন সে জানে, জীবন এক সোনালী ফানুস, যা একদিন নিভে যাবে।

মোমেন এগিয়ে আসে ধীর পায়ে। "তুমি কেমন আছো?"

অধরা হেসে বলে, "আমি ভালো আছি। কিন্তু তুমি?"

মোমেন জানে, সে ভালো নেই। কিন্তু সে হাসে। বলে, "ভালো থাকার ভান করছি।"

অধরা তাকিয়ে থাকে তার চোখের দিকে। "মৃত্যু আসলে কী, মোমেন?"

মোমেন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, "মৃত্যু মানে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নয়। মৃত্যু মানে এক নতুন সত্যের শুরু।"

অধরা মাথা ঝাঁকায়। "তাহলে আমরা কি একদিন সত্যিই আবার দেখা পাব?"

মোমেন এবার হেসে ফেলে। "যদি ভালোবাসা সত্য হয়, তবে নিশ্চয়ই।"

অধরা কিছু বলে না। বাতাসের সাথে তার ওড়না উড়ে যায়। দূরের আকাশে একটা পাখি তার ডানার নীচে সময় নিয়ে উড়ে যায়, অজানা কোনো গন্তব্যের দিকে।

মোমেন তাকিয়ে থাকে সেই পাখির দিকে।

এই পৃথিবী ফুরিয়ে যাবে, সময়ও একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু কিছু অনুভূতি হয়তো মৃত্যুর পরও থেকে যাবে। ভালোবাসা হয়তো সময়ের বাইরেও অপেক্ষা করবে, কোনো এক অনন্ত জীবনের দোরগোড়ায়।



মোমেন তাকিয়ে থাকে অধরার চোখের দিকে। তার ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা, যেন কিছু একটা খুব কাছাকাছি থেকেও ধরা দিচ্ছে না।

অধরা ধীরে ধীরে বলে, "জানো মোমেন, আমি ছোটবেলায় খুব ভয় পেতাম অন্ধকারে। মনে হতো, ঘরটাকে কেউ গিলে ফেলবে, চারপাশ থেকে যেন অদৃশ্য হাত এসে আমায় টেনে নিয়ে যাবে। তখন মা আমার কপালে হাত রাখতেন, বলতেন— ‘ভয় পাস না মা, আমি তোর পাশে আছি।’"

মোমেন কিছু বলে না। অধরার গলার স্বর ভারী হয়ে আসে। "একদিন যখন আমি সত্যিই চলে যাব, তখনও কি কেউ থাকবে পাশে? নাকি এই পৃথিবী তার নিয়মে এগিয়ে যাবে, আমি শুধু স্মৃতির কোনো এক ফাঁকে হারিয়ে যাব?"

হঠাৎ করে বাতাস থেমে যায়। সময় যেন থমকে দাঁড়ায়।

মোমেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তারপর আস্তে করে অধরার হাতটা ধরে। "মৃত্যু মানে হারিয়ে যাওয়া নয়, অধরা। মৃত্যু মানে অপেক্ষা।"

অধরা তার দিকে তাকিয়ে থাকে, চোখে জল জমে আসে। মোমেন বলে, "তুমি জানো তো, কেউ সত্যিকারের মরে না, যদি কেউ তাকে মনে রাখে।"

অধরা ম্লান হাসে। "কিন্তু সময়? সময় কি আমাদের একদিন ভুলিয়ে দেবে না?"

মোমেন এবার নিচের দিকে তাকায়, তারপর ধীরে ধীরে বলে, "হয়তো এই পৃথিবী একদিন সব ভুলে যাবে, কিন্তু কোনো এক অনন্ত প্রান্তে, কোনো এক না-দেখা ভোরের সীমানায়, আমরা আবার একে অপরের জন্য অপেক্ষা করবো। আমি অপেক্ষা করবো, অধরা।"

অধরার চোখ থেকে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।

চারপাশ নিস্তব্ধ। দূরের আকাশে একটা পাখি ডানা মেলে উড়ে যায়, তার ছায়া মাটিতে দীর্ঘ হয়ে পড়ে।

মোমেন মনে মনে বলে, "ভালোবাসা কখনো মরে না। মৃত্যু কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারে না।"


০৭-০৩-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।