চাঁদের কাছে স্বীকারোক্তি
- অপু চন্দ্র বর্মন

বাহিরে রোদে দীপ্ত প্রাসাদ,
দ্বারে ফুলে বসন্তের সাধ,
শঙ্খের ধ্বনি জাগে প্রভাতে,
হাসি ফুটে রাজপুত্রের হাতে।

চোখে তার নীল গগনের ঢেউ,
হাসি তার শান্ত নদীর বেউ,
প্রজারা ভাবে— রাজা আনন্দে,
দুঃখ তার নেই, সুখে জীবন বেঁধে।

রাজপথ জুড়ে পতাকা দোলে,
দীপ জ্বলে মেঘের কপোলে,
সোনালি ঘোড়া রথ টেনে আনে,
শঙ্খ বাজে উৎসব-গানে।

কিন্তু বুকের অন্তর-মাঝে,
শূন্যতা বাজে গোপন সাজে,
যেন পদ্মফুল ফুটে জলে,
শিকড় তার কাদায় তলে।

প্রাসাদের বারান্দায় সে হাসে,
নতুন দিনের আলোর কাছে,
ভিতরে শূন্যতা, হৃদয় ভরা,
বাহিরে ফুলের হাসি সেজে।

রাতে জানালায় দাঁড়ায় চুপে,
চাঁদেরে বলে দুঃখ যত রূপে,
“আমার হাসি অভিনয়ের মুকুট,
প্রকৃত আমি শূন্যতার যুক্ত।”

তার হৃদয় যেন মরুভূমির ঢেউ,
যেথা তৃষ্ণায় কাঁপে প্রাণের বেউ,
বাহিরে বাগান ফুলে ভরে,
ভেতরে বালি ঝড়ে ঝরে।

চোখে তার দীপ্ত নক্ষত্র-রেখা,
বুকে তার কান্না মেঘের দেখা,
যেন শীতের গগন হাসে নীল,
কিন্তু তলে জমে বরফের ঢিল।

প্রাসাদে উৎসব দীপালী জ্বলে,
নৃত্যে কাঁপে রঙিন দল মেলে,
রাজপুত্র হাসে তালে তালে,
মন তার ভাসে স্মৃতির জ্বালে।

শিশির ভেজা সকাল বনে,
বুকে বাজে গোপন ব্যথার সনে,
ফুল ফোটে, পাখি গায়,
কিন্তু অন্তর কাঁদে অজানায়।

সে যেন নাবিক ঝড়ের স্রোতে,
নৌকা ভাসে নীরব রোতে,
প্রজারা দেখে শান্ত তরী,
জানে না ঢেউ গোপন ভারী।

দিনের রঙে ফুলের খেলা,
রাতে কেবল শূন্যের মেলা,
যেন নদী শুকিয়ে ফাটল ফোটে,
তৃষ্ণার রোদে প্রাণ যে রোতে।

বুকের মানচিত্র ছিঁড়ে গেছে,
দিশাহারা মন হাওয়ায় বেঁচে,
বাহিরে সে আঁকে সোনালি পথ,
ভিতরে তার হারায় সেতু-স্রোত।

তার ঠোঁটে হাসি উৎসব-ঢং,
বুকে কান্না ঢেউয়ের সং,
যেন ঢেউ গায় শান্তির গান,
তলে গোপন ঘূর্ণি অজান।

রাত্রে চাঁদের আলোয় সে বসে,
অশ্রুর বিন্দু পড়ে জলে,
হৃদয়ে বাজে শূন্যতার বাঁশি,
বাহিরে হাসি ফুলের ভাষি।

একদিন প্রভাতে লিখিল সে পত্র,
অক্ষরে মিশে ব্যথার অন্ত্র,
“আমার রাজ্য কেবল রঙিন খেলা,
ভেতরে বেঁধে আছে শূন্যের মেলা।”

শব্দে জ্বলে অশ্রুর দীপ,
কাগজে জমে দুঃখের নীপ,
কলমের কালি নীল নয়, কালো,
যেন নিশির আকাশ ঢাকে আলো।

চিঠি লুকিয়ে রাখিল সে কুঠুরিতে,
যেন মুক্তো ঘুমায় সমুদ্র-গুহিতে,
কেউ তা জানবে না, কেউ পাবে না,
দুঃখ তার মুখোশে ঢাকা রবে না।

বছর কেটে গেল, উৎসব চলল,
রাজপুত্র হাসি দিয়ে জীবন ফলল,
কিন্তু প্রতিরাতে একই গান,
চাঁদে বলত— “আমি একা প্রাণ।”

রাত্রি আসে নীরব, বাতাসে দোলা,
প্রাসাদের আলো নেমে যায়।
হৃদয় হয় নিঃশব্দের কক্ষ,
ভেতরের ব্যথা কাঁদে একান্ত অশেষ।

একদিন হঠাৎ প্রভাতে ওঠে ধূসর,
মেঘে ঢাকা রোদ, ভোর নিঃশ্বাস নীরব।
রাজপুত্র হাঁটে প্রাসাদের পথে,
চুপে চুপে বয়ে যায় হৃদয়ের ঢেউ।

তার পদচিহ্ন পড়ে বালিতে গভীর,
যেন মরুভূমিতে ভিজে তৃষ্ণার সীমার।
দূর আকাশে উড়ে পাখির দল,
বুকে তার কাঁদে নিশীর বালির ঢল।

প্রজারা দেখে শান্ত চিত্ররূপ,
চিনে না ভিতরের অশ্রু-স্রোত।
হাসি তার যেন ঝরনার ঢেউ,
বুকের ভিতর ঘূর্ণি অশ্রুজল ফেউ।

চাঁদ তার গোপন বন্ধু হয়,
রাত্রে সে শোনে তার কান্নার সুর।
হৃদয়ে জমে পুরনো স্মৃতি,
যেন ঝরে পড়ে কুসুম ভোরবেলা।

প্রাসাদের বারান্দায় ঝড় বয়ে যায়,
ফুলের গন্ধও যেন ম্লান হয়ে যায়।
রাজপুত্র দাঁড়ায় নিঃশব্দে,
ভিতরে ভেঙে যায় শূন্যতার ঢেউ।

একদিন চিঠি খুলল সে নিজের হাতে,
অক্ষরে পড়ে দেখল জীবনের রূপমালা।
“আমি হাসি দিয়ে বাঁচি,
কিন্তু ভেতরে কাঁদি অবিরাম।”

চিঠিটি নিয়ে বসে নদীর ধারে,
বিন্দু বিন্দু অশ্রু মিশে জলে,
যেন নদী গোপন করে বালি,
ভেতরের ব্যথা গায় নিঃশব্দ ধ্বনি।

সন্ধ্যা আসে সোনালি রঙে,
আকাশে লুকায় চাঁদের আলো ঝলমল।
রাজপুত্র হাঁটে শান্ত প্রাসাদের পথে,
বুকের ভিতর জমে ব্যথার মন্দ।

তার চোখে ফুটে অজানা গল্প,
ভিতরে ঝরে একাকীত্বের জল।
হাসি তার মনে দীপ জ্বলে,
কিন্তু অশ্রু গোপন ঢেউয়ে বয়ে চলে।

মুখোশ পড়ে থাকে প্রাসাদের বুকে,
স্মৃতির মতো, অজানা ও চুপ।
কেউ খুঁজে না, কেউ বোঝে না,
হাসি তার শুধুই ইতিহাসে রবে।

চাঁদ সেই রাতে দেখল অজানার আলো,
নক্ষত্রও চুপ করে শুনল ব্যথার ধ্রুব আলো।
রাজপুত্র মিলল তার অন্তরের দেশে,
হৃদয়ে শান্তি, শেষ অশ্রুর ঘ্রাণে।

বছর কেটে যায়, বসন্ত আসে,
ফুল ফোটে, গায় চড়া পাখি।
রাজপুত্র দাঁড়ায় প্রাসাদের ধারে,
হৃদয়ে জমে স্মৃতির ভাঁজে আঁকা।

লোকেরা বলে— “তিনি সুখী, ধনী”,
চিনে না ভিতরের গোপন জাগরণ।
হাসি তার যেন ঝরনার ঢেউ,
বুকের ভিতর ঘূর্ণি অশ্রুজল ফেউ।

একদিন সে চুপ করে যায়,
প্রাসাদ ভরে তার নিঃশব্দ স্রোতে।
যেন পাখি উড়ে যায় আকাশে,
বুকে ঝরে ব্যথার শেষ আলোকে।

রাজপুত্র যায় নদীর ঢেউয়ে মিলায়,
পৃথিবীর সব মুখোশ ছেড়ে যায়।
বাহিরে হাসি আর কেউ দেখল না,
ভেতরে শান্তি, নিঃশব্দ ধ্বনি খেলা।

প্রজারা ভাবল— রাজা গেছে দূরে,
চিনে না অন্তরের গল্পের গূঢ়।
হাসি ছিল বাহিরের রূপকার,
ভেতরের নদী বয়ে গেল শূন্যতার পার।

চাঁদ তার সাথে রাত্রি সাক্ষী হয়,
নক্ষত্র শুনল শেষ ব্যথার ধ্রুব।
রাজপুত্র মিলল চিরন্তন দেশে,
হৃদয়ে শান্তি, অন্তরে মধুর আলো।

মুখোশ পড়ে রয়ে যায় প্রাসাদে,
যেন ইতিহাসের নিঃশব্দ স্মৃতিতে।
হাসি তার শুধুই গল্পে বাকি,
অন্তরের নদী মিলল চিরন্তন বাকি।

প্রজারা জানতে পারে না, কাহিনি সত্য,
মুখোশের আড়ালে জীবন কত কঠিন সত্য।
বাহিরে সে ছিল বসন্ত, ফুলের রাজা,
ভেতরে ঝরেছিল শূন্যতার কাঁদা।

বুকের ভিতরে গোপনী নদী বয়ে যায়,
হাসি তার রঙিন কিন্তু শূন্যতা আছে পাশে।
রাজপুত্র শিখেছে চুপে বাঁচতে,
মুখোশে ঢাকা আনন্দ, অন্তরে কাঁদতে।

শেষ বিকেলে প্রাসাদ নিঃশব্দ হয়,
বাতাসে আসে ফুলের গন্ধের স্রোত।
রাজপুত্র যায় নদীর ধারে,
মুখোশ ছেড়ে, শান্তির আলো ধারে।

অন্তরে মিলল নদীর শান্তি,
বাহিরে কেউ দেখল না ব্যথার রূপচিত্রি।
হাসি ভাসে ইতিহাসে শুধু,
রাজপুত্র মিলল চিরন্তন মুক্তি।

স্মৃতিতে রয়ে যায় মুখোশের ছায়া,
গল্পের মধ্যে বয়ে যায় সময়ের ধারা।
কেউ বুঝল না অন্তরের গান,
কেউ দেখল না অশ্রুর ধারা।

প্রজারা গায়— “রাজা ছিল আনন্দের মানুষ”,
চিনে না ব্যথার গভীর অনুভূতিশূন্য।
বাহিরে হাসি রঙিন ছায়া,
ভেতরে কাঁদে নিঃশব্দ বায়া।

চাঁদের আলো পড়ে নদীতে ধীরে,
প্রাসাদে শান্তি, নিঃশব্দে স্থিরে।
রাজপুত্র মিলল চিরন্তন দেশে,
ভেতরে মিলল সুখ, অন্তরে প্রাচীর নেই।

মুখোশের গোপন কাহিনি রয়ে যায়,
শুধু নদী জানে, চাঁদও জানে।
বাহিরে আনন্দ, ফুল, আলো,
ভেতরে অশ্রু, নিঃশব্দ ধ্বনি, ধ্বলো।

প্রজারা আসে উৎসব-গানে,
রাজা নেই, শুধু গল্পের আলোকে মানে।
হাসি রয়ে যায় ইতিহাসে,
অন্তরের নদী মিলল চিরন্তন শান্তিতে।

ফুল ফোটে, পাখি গান গায়,
মুখোশ পড়ে প্রাসাদের কক্ষে শান্তি ছায়।
রাজপুত্র মিলল চিরন্তন নীরবে,
অন্তরে ঝরে শেষ অশ্রুর ঢেউয়ে।

রাত্রি আসে, বাতাসে হাওয়া,
প্রজারা ভাবল— সুখী রাজা ছাড়া।
কিন্তু নদী জানে অন্তরের কথা,
মুখোশ ছেড়ে মিলল শান্তির বার্তা।

_____________________________
• রাজাগাঁও, ঠাকুরগাঁও
২৭ শ্রাবণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ।


১৮-০৮-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।