আমরা দুজনেই একদিন পৃথিবীতে থাকিব না
- অপু চন্দ্র বর্মন

আমরা দুজনেই একদিন পৃথিবীতে থাকিব না—
এই দেহরেখা, এই স্পর্শ, এই উষ্ণতা ক্ষয়মান—
জোৎস্নার শীতল আলোকেও একদিন মিলাইবে দেহের বিভা,
আকাশের অতলে ছায়াপথে মিলাইয়া যাবে নিঃশ্বাস।
তবু, হে প্রিয়তম, দেখো—
যখন কণ্ঠে উঠিয়াছিল বিষাক্ত বাক্যের শূন্য তীর,
যখন দৃষ্টি ছিল অগ্নিময়, বাক্য ছিল শূলসম,
তখনো অগোচরে হৃদয়ের গহন গহ্বর জাগাইত প্রেমপুষ্প।

আমাদের যুদ্ধ—
কখনো বৃষ্টিধারার ন্যায় অশ্রু জাগাইত,
কখনো ধুলিকণার মতন ক্ষুদ্র অভিমানে মিলাইত সব,
তবু, হে প্রিয়, সেই ধুলিকণায়ই উপমা জন্ম লভিল—
বালুকাবেলায় যেমন সমুদ্র অক্ষয় ছন্দে আছড়াইয়া যায়,
তেমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বন্দ্বে লুকায় রহস্যময় প্রেম।
তুমি বলিলে—বিদায়, আমি বলিলাম—ফিরিয়া এসো,
তুমি বলিলে—অন্তিম, আমি বলিলাম—চিরন্তন,
এভাবে কাব্যরেখায় আঁকলাম ক্ষণজন্মা জীবন।

দেখো, গোধূলির করুণ রং,
অম্লান সূর্য যখন জলে মিলাইয়া যায়,
তখনো আকাশে রঙের আঁচড় থাকে—
আমাদের ভালোবাসা তেমনই এক ধ্রুবপদচিহ্ন,
যা মৃত্তিকার অতলে মিশিয়া থাকিবে চিরদিন।
যুদ্ধ আমাদের ভাষা ছিল,
প্রেম আমাদের বেদ—
তোমার রূঢ় বাক্যে জাগিয়া উঠিত শাপলা-বিলাস,
আমার নীরব ক্রোধে জন্ম লভিত জবা,
তোমার চলে যাওয়া মানে ছিল শ্যামল নিস্তব্ধতা,
আমার ফিরে আসা মানে ছিল উতলা ভোরের শঙ্খধ্বনি।

হে প্রিয়, স্মরণ করো—
একদিন আমরা হেঁটেছিলাম নির্জন শিমুলবনে,
রক্তিম পাপড়ি ঝরিয়েছিল পদচিহ্নে,
তখনো জানিতাম না—আমাদের যুদ্ধ একদিন প্রেমে রূপান্তরিত হইবে,
যেমন বালুকাবেলায় ক্ষুদ্র শিলার নিচে লুকায় মুক্তো,
তেমনি রুক্ষ বাক্যের অন্তর্গত শূন্যতায় লুকায় ভালোবাসা।

আমরা দুজনেই একদিন থাকিব না—
তবু থাকিবে এই কথার বীজ,
থাকিবে বকুলবনের সুগন্ধ,
থাকিবে ভোরের শিশিরকণা,
যা বহিয়া নেবে যুদ্ধের জ্বালা—
রূপ দেবে প্রেমের প্রস্ফুটিত ফুলে।
তুমি যে দ্বন্দ্বের উল্লাসে আমাকে করিলে নিঃস্ব,
আমি সেই নিঃস্বতায় জন্ম দিলাম পূর্ণতার,
আমরা যে চোখে চোখে বিন্দু বিন্দু ক্রোধ জাগাইতাম,
সেই চোখে চোখে শপথ রাখিলাম চিরন্তন একতার।

এই পৃথিবীর মাটি একদিন টেনে নেবে দেহ,
কিন্তু কথা রবে, প্রেম রবে, অম্লান শপথ রবে—
যুদ্ধের তপ্ত রণক্ষেত্রে যাহা হ্রাস পাইলো,
প্রেমের স্নিগ্ধ অরণ্যে তাহাই বহিয়া নিল অক্ষয় মহিমা।
কত ক্রোধ, কত অভিমান, কত অপূর্ণ বাক্য!
সেইসব ভগ্ন বাক্য জুড়িয়া আমরা লিখিলাম মহাকাব্য—
যেখানে প্রেমই শেষ সত্য,
যেখানে যুদ্ধই প্রেমের গোপন সূত্র।

হে প্রিয়, একদিন যদি মহাশূন্যে মিলাই,
জেনে রেখো—আমরা দুইটি উল্কাপিণ্ড,
যুদ্ধের আগুনে পুড়িয়া প্রেমের আলোকজ্যোতি হইব।
এই মৃত্তিকা যাহা নেবে আমাদের হাড়, রক্ত, নাম—
সেই মৃত্তিকার অন্তঃস্থলে রবে প্রেমের অক্ষয় আখ্যায়িকা।

যদি কেহ কখনো জিজ্ঞাসা করে—
কেমন ছিল আমাদের জীবন?
বলিবে—যুদ্ধের মতন, প্রেমের মতন, মৃত্যুর মতন, অমৃতের মতন।
আমরা দুজনেই একদিন থাকিব না—
তবু থাকিব প্রেমরূপে, উপমার নীলে, কাব্যের অক্ষরে,
যেখানে বিরহ মানেই মিলন,
যেখানে যুদ্ধ মানেই প্রেম!


১৮-০৮-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।


slot gacor 2026 slot gacor situs slot gacor 2026