চিত্রশিল্পী
- মোঃ আমিনুল এহছান মোল্লা
চিত্রশিল্পী
করমেঃ মোঃ আমিনুল এহছান মোল্লা
রাওনাট, কাপাসিয়া,গাজীপুর
*******************************
চিত্রশিল্পী শেখ মোহাম্মদ সুলতান (এস. এম. সুলতান)
পরিচিতি
--------------------------------
পূর্ণ নাম: শেখ মোহাম্মদ সুলতান
ডাকনাম: লাল মিয়া
জন্ম: ১০ আগস্ট ১৯২৩, মসিমনগর, নারিকেলবাড়িয়া, যশোর (বর্তমান নড়াইল জেলা)
মৃত্যু: ১০ অক্টোবর ১৯৯৪, যশোর
পিতা: শেখ মেছের আলী
মাতা: মাজু বিবি
পেশা: চিত্রশিল্পী
জাতীয়তা: বাংলাদেশি
ধর্ম: ইসলাম
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
--------------------------------------
এস. এম. সুলতান ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকিতে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন।
তাঁর পিতা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি; ছোটবেলায় তিনি বাবার কাজের পাশে বসে কাঠে খোদাই করতেন নকশা।
গ্রামীণ জীবন, নদী, কৃষক, পশুপাখি — এগুলোই ছিল তাঁর প্রথম অনুপ্রেরণা।
তিনি নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন, তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করতে পারেননি।
তাঁর প্রতিভা দেখে জগদীশচন্দ্র বসু ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শরৎচন্দ্র রায় তাঁকে কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে (বর্তমান গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট) ভর্তি করিয়ে দেন ১৯৪১ সালে।
সেখানে তিনি প্রিন্সিপাল জামিনী রায়ের প্রভাবে নিজস্ব ঢঙে চিত্রকলার বিকাশ ঘটান।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই তিনি ১৯৪৩ সালে দেশ ছাড়েন এবং বহু দেশ ভ্রমণ করেন।
শিল্প-ভ্রমণ ও কর্মজীবন
---------------------------
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সুলতান ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সময় কাটান।
১৯৪৬ সালে কলকাতায় তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী হয়।
তাঁর কাজ দেখে বিখ্যাত শিল্পসমালোচক কামারুল হাসান ও জয়নুল আবেদিন গভীরভাবে মুগ্ধ হন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি কিছুদিন ভারতের কাশ্মীরে ও পাকিস্তানের লাহোরে বসবাস করেন।
১৯৫০ সালে তিনি পাকিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে বিদেশে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে) “Art Mission”-এ অংশগ্রহণ করেন।
তাঁর চিত্রকর্ম নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, রোম, ও লাহোরে প্রদর্শিত হয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা লাভ করে।
শিল্পভাবনা ও বিষয়বস্তু
------------------------------------------
এস. এম. সুলতানের চিত্রকর্মে প্রধান বিষয় বাংলার কৃষক ও গ্রামীণ জীবন।
তিনি বিশ্বাস করতেন — “এই মাটির মানুষই আসল সভ্যতার নির্মাতা।”
তাঁর ক্যানভাসে কৃষকরা পেশীবহুল, শক্তিমান, বীরপুরুষের মতো; যেন বাঙালি জাতির আত্মশক্তির প্রতীক।
তাঁর ছবিতে আকাশ ও মাটির রঙের সংমিশ্রণ, মানুষ ও প্রকৃতির মৈত্রি,
এবং অত্যন্ত বোল্ড ব্রাশস্ট্রোক তাঁকে অন্য সবার থেকে আলাদা করেছে।
তিনি শহুরে জীবনের কৃত্রিমতা নয়,
বরং গ্রামের কৃষক, নৌকা, হাল, ধানক্ষেত, নদী—এই বাস্তবতার ভেতরেই খুঁজে পেয়েছেন বাংলার আত্মা।
উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম
----------------------------------
প্রথম বৃক্ষরোপণ (১৯৭৫)
চর দখল (১৯৭৬)
মাছ ধরা (১৯৮৬)
জমি চাষ (১৯৮৬)
গ্রামীণ জীবন (১৯৯০)
Fishing-3 (১৯৯১)
কৃষকের জয় (অপ্রকাশিত)
পুরস্কার ও সম্মাননা
--------------------------------------
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক “Man of Achievement” পুরস্কার, ১৯৮২
এশিয়া উইক পত্রিকা কর্তৃক “Man of Asia”, ১৯৮২
একুশে পদক, ১৯৮২
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৪
স্বাধীনতা পুরস্কার (মরণোত্তর), ১৯৯৬
ব্যক্তিগত জীবন ও অবদান
----------------------------------------
সুলতান অবিবাহিত ছিলেন।
জীবনের শেষভাগে তিনি নিজ জন্মভূমি নড়াইলে ফিরে আসেন এবং সেখানেই গড়ে তোলেন—
“নড়াইল আর্ট গ্যালারি” (বর্তমানে এস. এম. সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা)।
তিনি শিশুদের জন্য গড়ে তোলেন “শিশু স্বর্গ” নামের একটি আর্ট স্কুল,
যেখানে গ্রামের বাচ্চারা বিনা পয়সায় আঁকতে শিখত।
তিনি ছিলেন প্রকৃত মানবপ্রেমিক, সমাজসেবক ও দার্শনিক শিল্পী—
তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র ছিল,
“মানুষের মুক্তি কেবল মাটির সঙ্গে সম্পর্কেই নিহিত।”
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
---------------------------------
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
নড়াইলের চিত্রা নদীর তীরে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
আজও তাঁর বাড়ি ও গ্যালারি প্রতি বছর “সুলতান মেলা”-র মাধ্যমে শিল্পপ্রেমীদের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
তাঁর নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে “এস. এম. সুলতান ফাউন্ডেশন” ও “সুলতান স্মৃতি সংসদ”।
বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলায় তাঁর স্থান অবিস্মরণীয়, কিংবদন্তি ও বিপ্লবী শিল্পদ্রষ্টা হিসেবে।
সারসংক্ষেপ (সংক্ষিপ্ত তথ্য)
বিষয় তথ্য
-------------------------------------------------
পূর্ণ নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান
জন্ম ১০ আগস্ট ১৯২৩, নড়াইল
মৃত্যু ১০ অক্টোবর ১৯৯৪
পরিচিতি বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনধর্মী চিত্রশিল্পী
উল্লেখযোগ্য কাজ প্রথম বৃক্ষরোপণ, চরদখল, জমি চাষ
পুরস্কার একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার
আদর্শ কৃষক-প্রকৃতি কেন্দ্রিক সমাজদর্শন
প্রতিষ্ঠান নড়াইল শিশুস্বর্গ, সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা
উপাধি Man of Asia (Asia Week, 1982)
***********************************************************
চিত্রশিল্পী
লাল মিয়া যে চিত্রে জীবন ফুটিয়েছেন,
কৃষকের হাল, নৌকা, মাঠ-খেত, নদী তার ক্যানভাসে বয়ে গেছে।
প্রতিটি ব্রাশস্ট্রোক যেন বলছে –
“মাটি, মানুষ ও সংগ্রাম একে অপরের ছায়া।”
শৈশবের মাটি তাকে শিখিয়েছে আঁকার প্রথম পাঠ,
বাবার কাঠমিস্ত্রির খোদাইতে চোখ রেখে,
তাঁর মন ভরে গেছে জীবনের রঙে।
প্রেমে, প্রকৃতিতে, শ্রমে, সংগ্রামে –
শিশু লাল মিয়া হয়ে ওঠে সৃষ্টিশীল শিল্পী।
কলকাতার আর্ট স্কুলে পা রাখার আগে,
আকাশ-পাতার মাঝে, নদীর ধারে, কাশ্মীরের শৃঙ্গগোলায়,
তিনি শিখেছেন জীবন নিজস্ব রূপে প্রকাশ করার কৌশল।
শহুরে চকমক নয়, বরং গ্রামের নিভৃত স্বপ্নে,
পাখি, কৃষক, ঘোড়া ও নদী হয়ে ওঠে তাঁর শিল্পকর্মের প্রাণ।
গ্রামের মানুষ তাঁর দেবদূত, কৃষক-পুরুষ-নারী—
বলিষ্ঠ, শক্তিশালী, yet কোমল হৃদয়ের সাথে।
তাঁরা কেবল জীবিকা নয়, সংস্কৃতির প্রতীক।
তাঁর ক্যানভাসে দেখা যায় শ্রমের মহিমা,
আদিম সংগ্রামের রঙ, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
শিল্পী ও বোহেমিয়ান, স্বাধীনচেতা মন:
শহর-নগরীর কৃত্রিমতায় তিনি বঞ্চিত,
প্রকৃতির রোমান্টিকতায় নিজেকে খুঁজে পান।
যেখানে বৃক্ষ-নদী-মাটির সঙ্গে মিলিত হয় মানব মন,
সেখানে জন্ম নেয় শক্তিশালী, জীবন্ত চিত্র।
মৃত্যুর পরে তাঁর ক্যানভাস গড়ে ওঠে কিংবদন্তি,
যা শিক্ষায়, শিল্পে, সমাজে চিরস্থায়ী।
শিশুদের শিক্ষা, মানুষের সেবা, গ্রামীণ সংস্কৃতি—
এসবকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য করেছেন তিনি।
লাল মিয়া চেয়েছিলেন,
গ্রামেই গড়ে উঠুক সভ্যতার আলো,
কৃষক-মানুষের পেছনে লুকানো শক্তি
হয়ে উঠুক বিশ্বের পথপ্রদর্শক।
আজও নড়াইলের নদী, মাঠ-খেত, গাছের ছায়া
বলছে সুলতানের কথা –
যে চিত্রশিল্পী কৃষকের হৃদয়কে আঁকতে শিখেছেন,
যে মানুষ প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন,
যে শিল্পী চিরন্তন গ্রাম বাংলার কাব্যিক দ্যুতি।
লাল মিয়া চিত্রে, সুরে, বাঁশিতে,
বাংলার মাটির সঙ্গে মিলিত হয়ে গেছেন চিরদিন।
শিল্প, শ্রম ও মানবপ্রেম—
এসবই তাঁর চিরস্মরণীয় দ্যুতি।
---------------------------------------সুত্র অনলাইন।
০৪-১০-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।