নির্বাসন অথবা ভিন্ন সুর
- প্রসূন গোস্বামী
অভিরূপ এখন আর রিকশার হুড নামিয়ে
স্নিগ্ধার খোলা চুলের ওড়াউড়ি দেখে না;
শাহবাগের মোড়ে বা টিএসসির চায়ের কাপে
আজকাল আর কোনো তিতাস নদীর গল্প জমে না।
স্নিগ্ধা তার কপালে আজকাল লাল টিপটা আর পরে না,
তার চিবুক ছুঁয়ে নেমে আসে এক আরোপিত ছায়া,
যেন এক অচেনা স্রোতে ভেসে যাচ্ছে—
হাজার বছরের নদীমাতৃক সুর, বাউল গান আর মাটির মায়া।
চারপাশে চেয়ে দেখো অভিরূপ,
সবাই কেমন এক লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে,
সবার ভাষা, সবার পোশাক, সবার ভাবনায়
একই রকম এক জোব্বা জড়ানো স্তব্ধতা।
কারো চোখে আর কোনো সংশয়ের প্রশ্ন নেই,
কারো ঠোঁটে আর কোনো প্রতিবাদের আগুন নেই,
সবাই মিলে এক বিশাল অন্ধ সমতলে হেঁটে যাচ্ছে,
স্বেচ্ছায় সঁপে দিচ্ছে নিজের আদিম বাঙালি সত্তা।
হুমায়ুন আজাদ বেঁচে থাকলে হয়তো বলতেন—
"যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সে সমাজ তো আসলে এক জীবন্ত কবর!"
অথচ দেখো, আজ সবাই একই বচনে মাথা নাড়ছে,
একই স্রোতের পাকে নিজেদের অস্তিত্বের বৈচিত্র্যকে বিসর্জন দিচ্ছে।
অভিরূপ, তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না?
এই একাত্মতা কোনো মিলন নয়,
এই অন্ধভাবে এক হয়ে যাওয়া আসলে এক গভীর সাংস্কৃতিক আত্মহত্যা!
আমাদের আলপনা আঁকা পথ, আমাদের একুশের প্রভাতফেরি,
সব আজ ধুয়ে যাচ্ছে এক মরুময় অচেনা ঝড়ে।
স্নিগ্ধা, তুমিও কি তবে সেই মিছিলেই মিশে গেলে?
যেখানে ভিন্নমতের কোনো স্থান নেই,
যেখানে রবীন্দ্রনাথের গান অপরাধ,
আর লালনের একতারাকে বলা হয় পাপ!
যদি সবাই একই সমস্বরে চিৎকার করে আকাশ কাঁপায়,
তবে আমি সেই কোলাহলে নিঃসঙ্গ হতে চাই।
আমি দেখতে চাই না এই একমুখী স্রোতের জয়জয়কার,
যেখানে আমার চিরচেনা বাংলাদেশ তার নিজের রূপ হারিয়ে
এক কাল্পনিক অভিন্নতার খাঁচায় বন্দি হচ্ছে।
তার চেয়ে এসো অভিরূপ, আমরা দুজনে ভিন্ন পথ বাছি,
সবাই যেখানে একমত হয়ে অতল গহ্বরে ঝাঁপ দিচ্ছে,
সেখানে আমরা অন্তত নিজেদের বাঙালি অস্তিত্ব নিয়ে,
সংশয় আর তর্কের বেঁচে থাকা আলোয়—
আলাদা হয়ে, একা হয়ে, নিজেদের স্বাতন্ত্র্যে বেঁচে থাকি।
২৮-০৬-২০২৬
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।