নির্বাক প্রহর ও আমাদের অক্ষত ছায়া
- প্রসূন গোস্বামী

একটু ভিন্ন সুরে কাঁদা যাক,
কিংবা শোনানো যাক একাকী বেঁচে থাকার কোনো স্তব্ধ উপাখ্যান।
যেখানে মেঘ জমলেই বৃষ্টির বদলে ঝরে পড়ে শঙ্কা,
আর বাতাস ছুঁয়ে আসে কোনো চেনা চত্বরের চণ্ডীপাঠের বদলে—
রক্তাক্ত চিৎকারের তীব্র উল্লাস।

সবাই যখন একসুরে স্লোগান তোলে,
যখন হাজারো হাত এক হয়ে ভেঙে ফেলে উপাসনালয়ের প্রাচীন চিলতে দেওয়াল,
তখন তুমি ওই সমবেত চিৎকারে গলা মিলাতে পারো না।
কারণ, ওই সমবেত স্বর তোমারই ঘরের দাওয়ায় এসে থমকে দাঁড়ায়,
ওই মিলিত উন্মাদনা খুঁজে ফেরে তোমার চেনা নাম, তোমার চেনা ঈশ্বর।

"একটা একটা হিন্দু ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর—"
এই তো সেই চেনা স্বর, যা এখন গলির মোড়ে মোড়ে শান দেয় নিজের ক্ষুর।
এই তো সেই তৌহিদী প্লাবন, যা ভিন্নমত আর ভিন্ন বিশ্বাসকে
এক নিমেষে গ্রাস করতে ধেয়ে আসে রক্তের তৃষ্ণায়।

প্রসঙ্গত, প্রদীপের কথা বলা যাক।
কিংবা বলা যাক সুপ্রিয়ার সেই উঠোনের তুলসীতলার কথা।
তারা কোনো অন্যায় করেনি, তারা শুধু চেয়েছিল নিজেদের মতো করে বাঁচতে।
তারা ভিড়ের অংশ হতে পারেনি, ভিড়কে ভয় পেয়েছিল।
আজ তাদের ভাঙা ঘরের কোণে শুধু পড়ে আছে কিছু ছাই,
আর বাতাসে ভেসে বেড়ায় পুড়ে যাওয়া চন্দনকাঠের গন্ধ।
তারা সমবেত স্রোতে গা ভাসায়নি বলেই, আজ তারা নিখোঁজ ডায়েরির পাতা।

অথবা সেই বুড়ো পুরোহিত, যিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে
সবার মঙ্গলের জন্য জল ঢেলেছেন শিবের মাথায়।
আজ তাঁরই রক্তে ধুয়ে যায় মন্দিরের চাতাল।
এখানে একমত না হওয়ার শাস্তি—একাকী মরে যাওয়া,
আর একমত হওয়া মানে—নিজের অস্তিত্বকে নিজের হাতেই বলি দেওয়া।

তাহলে উপায় কী?
এই হিংস্রতার মিছিলে শামিল হয়ে নিজের নাম বদলে ফেলা?
নাকি অন্ধ ভিড়ের সমবেত হুংকারে মাথা নিচু করে সম্মতি দেওয়া?
না, তার চেয়ে বরং নিজের একাকিত্বে অনড় থাকা ভালো।
নিজের বিশ্বাসের জীর্ণ কুটিরে বসে, দরজায় খিল এঁটে
বেঁচে থাকার শেষ যুদ্ধটা লড়ে যাওয়া ভালো।

ঐ দেখো, টগবগে উন্মাদনায় ছুটে যাচ্ছে একদল চেনা-অচেনা যুবক।
তাদের চোখে কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো সংশয় নেই।
তারা সবাই একমত, তারা সবাই এক সুরে দীক্ষিত।
তারা তরবারি উঁচিয়ে চলেছে এক মহাসম্মতির দিকে।
তারা ভাবছে, সবাইকে এক ছাঁচে ফেলে তারা স্বর্গের সিঁড়ি ছুঁয়ে ফেলবে।

কিন্তু তারা জানে না,
যে সিঁড়ি বেয়ে তারা অন্ধ অহংকারে উপরে উঠছে—
সবাইকে মুছে দিয়ে, সবাইকে এক কায়দায় জবাই করে—
সেই সিঁড়ির শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছে এক অতল শূন্যতা।
যেখানে পৌঁছানোর পর, নিজেদের কাটাকাটি করা ছাড়া
তাদের আর কোনো ভিন্নমত অবশিষ্ট থাকবে না।

আমরা বরং এই নরকে দাঁড়িয়েও নিজেদের ভিন্নতায় বেঁচে থাকি,
যতক্ষণ শ্বাস আছে—নিজের নামে, নিজেরই ঈশ্বরের ছায়ায়।


২৯-০৬-২০২৬
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।


slot gacor 2026 slot gacor situs slot gacor 2026