???? অগ্নিশিখা থেকে আলোকশিখা ????
- অনুপ কুমার বিশ্বজিৎ
— একটি ঐতিহাসিক মহাকাব্য
---
প্রস্তাবনা
হে অনন্ত ইতিহাস,
তুমি জানো,
সময়ের গর্ভে কত রক্ত, কত অশ্রু, কত ছাই
মিশে আছে।
তুমি জানো—
কখনও ধর্মের নামে মানুষ মেরেছে মানুষকে,
কখনও অমানবিক শিকল ছিঁড়ে
মানুষ জিতেছে জীবনের অধিকার।
আজ আমি গাই সেই কাহিনি—
যেখানে নারীর জীবনে একদিকে
চিতার আগুনের ভয়াল শিখা,
অন্যদিকে মুক্তির শঙ্খধ্বনি।
একদিকে সতীদাহের ধোঁয়া,
অন্যদিকে বিধবা বিবাহের আলো।
এই দুই বিপরীত পথের সংগ্রামই
আজ আমার মহাকাব্যের বাণী।
---
প্রথম সর্গ : সতীদাহের অগ্নি
গঙ্গার ঘাটে ঢেউ থেমে যায়,
যখন বাজে ঢাক, মন্ত্র আর শঙ্খধ্বনি—
“সতী! সতী!”
চিতার আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এক নারী,
তার কণ্ঠে নেই গান,
চোখে নেই ভোরের আশা,
শুধু মৃত্যু তাকে টেনে নেয় অগ্নিকুণ্ডে।
ধর্মের নামে আনন্দ করে জনতা,
মন্ত্রোচ্চারণে ঢেকে যায় আর্তনাদ।
পুরোহিত বলে—
“সে দেবী হলো, স্বর্গে যাবে।”
কিন্তু কে জানে—
সে শুধু বাঁচতে চেয়েছিল,
সে শুধু চাইত শিশুর মুখে আবার হাসি দেখতে।
রাজপুতানার প্রাসাদ থেকে
বাংলার হুগলি, কাশী—
সতীদাহ ছড়িয়ে পড়ে সমাজে।
নারীর দেহ জ্বলতে থাকে,
মানবতার বুক জ্বলে তার সাথে সাথে।
---
দ্বিতীয় সর্গ : বিধবার জীবন
যে নারী বাঁচে,
তার জীবনও মৃত্যুর চেয়ে কঠিন।
কপালে সিঁদুর নেই,
গলায় শাঁখা নেই,
চোখে নেই রঙের স্বপ্ন।
গায়ে শুধু সাদা শাড়ির কারাগার।
সমাজ তাকে বলে—
“তুমি অমঙ্গল, তুমি অভিশাপ।”
বিয়ের আসরে সে নেই,
উৎসবের ভিড়ে তার ঠাঁই নেই,
তার গান থেমে যায়,
তার হাসি শুকিয়ে যায়।
সে বাস করে ঘরের এক কোণে,
ভগ্ন হাড়কাঠির মতো।
তার জীবন ম্লান,
তার ভবিষ্যৎ শূন্য।
সে জানে—
সে বেঁচে থেকেও মৃত।
তার চারপাশে দেয়াল,
তার ভেতরে হাহাকার।
---
তৃতীয় সর্গ : মানবতার কান্না
নদী শোনে সেই কান্না,
আকাশ কাঁপে দীর্ঘশ্বাসে,
কিন্তু সমাজ বধির,
পুরুষতন্ত্র অন্ধ।
একটি শিশু তার মায়ের কণ্ঠ হারায়,
একটি ঘর শূন্য হয়ে যায়,
একটি সমাজ ভরে ওঠে শবদাহের গন্ধে।
তবুও তারা বলে—
“এটাই ধর্ম, এটাই নিয়ম।”
কেউ প্রশ্ন করে না—
“নারী কি মানুষ নয়?
নারীর কি বাঁচার অধিকার নেই?”
কেউ শোনে না হৃদয়ের মিনতি।
মানবতা তখন শিকলবন্দি,
কুসংস্কারের কারাগারে বন্দী।
ধর্ম হয়ে ওঠে হত্যার ছদ্মবেশ।
---
চতুর্থ সর্গ : রামমোহনের অগ্নি
কিন্তু ইতিহাস থেমে থাকে না।
একদিন জন্ম নিলেন এক মানুষ—
রাজা রামমোহন রায়।
তিনি দেখলেন সেই অগ্নিকুণ্ড,
শুনলেন সেই আর্তনাদ,
আর কলম হাতে লিখলেন বিদ্রোহের বাণী।
তিনি বললেন—
“এ কোন ধর্ম, যা নারীকে মারে?
এ কোন ঈশ্বর, যে হত্যাকে আশীর্বাদ করে?”
তার কণ্ঠে বাজল মানবতার সুর,
তার যুক্তি কাঁপাল সমাজের ভিত।
তিনি একাই দাঁড়ালেন শত বিরুদ্ধতার মাঝে,
কিন্তু থামলেন না।
১৮২৯ সালে
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক
আইনের কলমে ঘোষণা করলেন—
সতীদাহ নিষিদ্ধ।
অগ্নির অধ্যায় নিভে গেল,
কিন্তু নারীর জীবন তখনও
অন্ধকারের কারাগারে বন্দী।
---
পঞ্চম সর্গ : বিদ্যাসাগরের আলোক
তারপর এলেন আরেক বীর—
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
আলোকপুরুষ, দয়ার সাগর,
শিক্ষার দেবতা, মানবতার যোদ্ধা।
তিনি দেখলেন—
সতীদাহ নিভেছে ঠিকই,
কিন্তু বিধবার জীবন এখনও মৃত।
তিনি নিলেন কলম,
নিলেন শাস্ত্রের শ্লোক,
এবং যুক্তির দীপ্ত বজ্র।
তিনি বললেন—
“নারীও মানুষ।
নারীরও অধিকার আছে সংসারে,
অধিকার আছে প্রেমে,
অধিকার আছে জীবনের আনন্দে।”
শাস্ত্র থেকে প্রমাণ করলেন—
কোথাও লেখা নেই বিধবা বিয়ে পাপ।
কুসংস্কারই বেঁধে রেখেছে নারীকে।
---
ষষ্ঠ সর্গ : আইন ও আলোর জয়
বিদ্যাসাগরের সংগ্রামে কাঁপল সমাজ,
কাঁপল ধর্মান্ধতার দুর্গ।
অসংখ্য প্রতিবাদ, অশ্রু, অপমান—
সব সয়ে তিনি চললেন।
অবশেষে ১৮৫৬ সালে
আলো ফুটল নতুন প্রভাতে।
হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন—
একটি যুগান্তকারী ঘোষণা।
আইন বলল—
“বিধবা নারীও বিয়ে করতে পারবে।”
এই কণ্ঠে ধ্বনিত হলো নতুন জীবনগান।
নারীর চোখে জ্বলল আশার প্রদীপ,
শতাব্দীর অন্ধকার ভেদ করে
আসলো রঙ, আসলো হাসি।
---
সপ্তম সর্গ : সংগ্রামের মূল্য
কিন্তু সমাজ কি সহজে মানে?
না, ধর্মান্ধরা রটাল কুৎসা,
বিদ্যাসাগরের ঘর ভাঙল,
তার নামে ছুঁড়ে দিল অভিশাপ।
কেউ বলল—
“তুমি ধর্ম ভাঙছো।”
কেউ বলল—
“তুমি অমঙ্গল আনছো।”
কিন্তু তিনি থামলেন না।
মানবতার জন্য তিনি বাঁচলেন,
মানবতার জন্য লড়লেন।
তার রক্তে, তার ঘামে, তার ত্যাগে
নারী পেল মুক্তির দিশা।
---
অষ্টম সর্গ : উপসংহার
হে ইতিহাস, তুমি সাক্ষী—
সতীদাহের আগুনে পুড়েছিল নারী,
কিন্তু সেই আগুন পুড়িয়েছিল মানবতাকেও।
হে ইতিহাস, তুমি সাক্ষী—
বিদ্যাসাগরের আলোয় জেগেছিল নারী,
কিন্তু সেই আলো জাগিয়েছিল সমাজকেও।
এই মহাকাব্যের বাণী তাই—
অগ্নিশিখা থেকে আলোকশিখা,
অন্ধকার থেকে আলোর জয়।
সতীদাহের মৃত্যুর ছাই ভেদ করে
বিধবা বিবাহের মুক্তির শঙ্খধ্বনি।
১৯-০৯-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।