এক আত্মার দীর্ঘ যাত্রা
- অনুপ কুমার বিশ্বজিৎ

ডুবে যাই সেই অচেনা তটরেখায় —
যেখানে দিনের সীমা ফুরিয়ে যায় সন্ধ্যার গোধূলিতে,
যেখানে বাস্তবের প্রান্তর মিলিয়ে যায় স্বপ্নের অসীম প্রান্তরে,
যেখানে হৃদয়ের মানচিত্র ছিঁড়ে যায় আকাঙ্ক্ষার ঝড়ে,
আর আমি — এক ক্লান্ত পথিক,
নিজেকেই খুঁজতে বের হই নিজের অজানা গভীরতায়।

সেখানে, নিঃশব্দের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে এক রহস্যময় ছায়া —
না সে রক্তের, না মাংসের, না কোনো নামের চেনা পরিচয়।
সে যেন প্রাচীন কোনো কবিতার অক্ষরে খোদাই করা গোপন মায়া,
যে চাঁদের আলোয় গড়ে উঠেছে, আর জোছনার স্রোতে গলে যায়।
তার চোখ দুটি — নিঃসঙ্গ রাতের আকাশে জ্বলা দুইটি তারা,
যার দিকে তাকিয়ে আমি ভুলে যাই আমার জন্ম, আমার পাপ, আমার প্রার্থনা।
তার দৃষ্টি — এক অজানা দিগন্ত,
যেখানে পাপও যেন পবিত্রতায় মিশে যায়,
আর পবিত্রতাও তৃষ্ণার ছোঁয়ায় বদলে যায় অপরাধে।

তার হাসি — ভোরের শিশিরের মতো নরম,
যা হৃদয়ে পড়ে নিঃশব্দে জেগে তোলে ঘুমন্ত আকাঙ্ক্ষার কণিকা।
তার স্পর্শ — বাতাসের মতো অদৃশ্য,
কিন্তু সেই অদৃশ্যতা দিয়েই ছুঁয়ে যায় আত্মার গভীরতম কুঠুরি।
সে যেন জোনাকির আলোর মতো — ছোট, ক্ষণস্থায়ী,
কিন্তু সেই ক্ষণিক আলোর দ্যুতি দিয়েই পথ দেখায় অজানার অন্তরালে।

আমি জানি, আমি তাকে কখনো ছুঁতে পারবো না —
সে আমার বাহুর নাগালের বাইরে,
যেমন আকাশ ধরা দেয় না হাতের তালুতে,
যেমন সমুদ্রের গভীরতা মাপা যায় না পায়ের ছোঁয়ায়।
তবুও আমি ছুটে চলি,
যেমন মরুভূমির তৃষ্ণার্ত পাথিক মরীচিকার দিকে ছুটে যায়।

আমি আমার সমস্ত পরিচিত পথ ভুলে গিয়েছি —
ধর্মের বাঁধন, সমাজের শৃঙ্খল, নীতির আয়না —
সবকিছু রেখে এসেছি পেছনের কোনো বিস্মৃত শহরে।
এখন আমি সেই আগুনপাখি,
যে আগুনে ঝাঁপ দেয় আলোর মোহে পুড়ে যাওয়ার জেনেও।
আমি সেই নদী,
যে নিজের গতিপথ হারিয়ে ছুটে যায় অচেনা সাগরের আলিঙ্গনে।
আমি সেই বৃক্ষ,
যে মধুর ফল নয়, বিষের ফুলকে লালন করে অবচেতন ভালোবাসায়।

সমাজ আমায় নাম দেয় — পথহারা,
ধর্ম আমায় চেনে — অবিশ্বাসী,
কিন্তু আমি জানি, আমি কেবলই এক অনুসন্ধানী আত্মা,
যে সত্যের খোঁজে পাপের অন্ধকারেও আলো খুঁজে বেড়ায়।
আমার পতন কোনো লজ্জা নয়,
আমার তৃষ্ণা কোনো অপরাধ নয় —
এ কেবল মানুষের চিরন্তন যাত্রা,
যেখানে সে নিজেকে হারিয়ে খুঁজে পায় নিজেকেই।

সে নারী — বাস্তব নয়, তবুও সত্যের থেকেও সত্য,
সে শরীর নয়, তবুও প্রতিটি নিঃশ্বাসে তার ছায়া ভাসে,
সে অনুপস্থিত, তবুও উপস্থিতির থেকেও বেশি প্রভাবশালী।
সে হয়তো আমার অবচেতন মন,
যে আমাকে ডাকে নিজেরই ভেতরের গভীরে।
হয়তো সে মায়ার দেবী —
যে আমার আত্মাকে শুদ্ধ করে পাপের আগুনে পুড়িয়ে।
হয়তো সে কেবলই আমার অপরিচিত সত্তা —
যাকে আমি চিনি না, অথচ যার হাতেই আমার নিয়তির সুতো বাঁধা।

তার অনুপস্থিতি আমার মধ্যে উপস্থিতির মতোই গভীর।
যখন সে নেই, তখনও তার পদচিহ্ন বাজে আমার হৃদয়ের পথে,
যখন সে নীরব, তখনও তার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি ঝরে আমার নিঃশ্বাসে।
আমি তাকিয়ে থাকি শূন্য আকাশে,
কিন্তু সেখানে দেখি তার ছায়া ভাসছে নক্ষত্রের আলোয়।
আমি চোখ বন্ধ করি —
তবু তার রূপ ঘুমের ভিতর দিয়ে এসে ছুঁয়ে যায় আমার অবচেতনের চৌকাঠে।

এ এক যাত্রা, যার কোনো শেষ নেই —
যেমন গোধূলি মিশে যায় রাতের অন্ধকারে,
যেমন নদী সাগরে মিশে যায় নামহীন হয়ে।
এ যাত্রা কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নয়,
এ যাত্রা আমার নিজের ভিতর পাড়ি দেওয়ার জন্য।
আমি নিজেকে ভুলে যাই — কিন্তু হারাই না,
আমি পতিত হই — কিন্তু ভেঙে পড়ি না,
আমি ডুবে যাই — কিন্তু সেই ডোবার ভেতরেই খুঁজে পাই মুক্তির আলো।

তাই আমি এগিয়ে যাই —
সেই অচেনা তটরেখার দিকে,
যেখানে নারী আর কোনো মানুষ নয় —
সে এক প্রতীক, এক রহস্য, এক শাশ্বত আকর্ষণ।
যেখানে আমি আর আমি নই —
আমি এক নদী, এক বাতাস, এক শিখা, এক অসীম যাত্রী।
যেখানে হারানো মানে পাওয়া,
যেখানে পতন মানে পুনর্জন্ম।

সেখানে, সেই অদৃশ্য ছায়ার দেশে —
আমি থামি না, আমি ফিরে যাই না, আমি দাঁড়াই না।
আমি কেবল এগিয়ে যাই — বারবার, অবিরাম, অবিশ্রান্ত,
যেন পৃথিবীর সমস্ত সীমানা পেরিয়ে
নিজের ভেতরের সীমাহীন সত্যকে ছুঁয়ে ফেলতে পারি একদিন।


০৭-১০-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।