অগ্নিকুসুমের মহাকাব্য
- অনুপ কুমার বিশ্বজিৎ
(এক আত্মদগ্ধ প্রেমিকের গাথা)
---
প্রস্তাবনা : আগুনের জন্মগাথা
প্রেমের পূর্বে ছিল কেবল ছাই।
দেবতারা ক্লান্ত, মানুষ নিঃস্পন্দ।
ঈশ্বর বলেছিলেন— “এক ফুল দাও,
যার রঙ হবে জ্যোতিষ্মান আগুনের মতো,
যার গন্ধে কেউ বাঁচবে না— কেবল জ্বলবে।”
তখনই জন্ম নিলে তুমি—
অগ্নিকুসুম,
অলৌকিক সেই রূপক রাণী।
তোমার চোখে ছিল নীরব বিদ্যুৎ,
তোমার স্পর্শে মৃত্যুরও শান্তি।
তুমি ছিলে স্বর্গের ভুল,
আর আমি, সেই ভুলের তপস্বী প্রেমিক।
---
অধ্যায় ১ : প্রথম আলো, প্রথম তৃষ্ণা
প্রথম দেখা—
তুমি সূর্যের কোল ঘেঁষে দাঁড়ানো এক মেঘ,
ভিতরে বৃষ্টি, বাহিরে অগ্নি।
তোমার হাসি যেন ঝরে পড়া অমিয়,
যা স্পর্শ করলেই প্রাণ জ্বলে ওঠে।
সেদিনই বুঝেছিলাম—
ভালোবাসা মানে বাঁচা নয়,
ভালোবাসা মানে জ্বলে উঠেও
হাসতে শেখা,
মৃত্যুকেও ফুলের মতো গ্রহণ করা।
তোমার কণ্ঠে ছিল মন্ত্র,
যা শুনলেই হৃদয়ে অগ্নি জ্বলে,
চোখে ছিল গোপন আহ্বান—
অন্তরাত্মার তীব্র স্পন্দন।
---
অধ্যায় ২ : আকর্ষণের নগরী
তোমার নামের ভিতরেই আমি গড়েছিলাম এক রাজ্য—
যেখানে নদী বয় তোমার সুবাসে,
আর বাতাসে উড়ে তোমার অনুপস্থিত স্পর্শ।
রাত্রি নামলে, তুমি নেমে আসো বুকের ভিতরে—
স্বপ্ন হয়ে, ধোঁয়া হয়ে,
কখনো নীরব, কখনো ব্যাকুল।
আমার হাতের রেখায় তুমি জ্বেলে দিলে অগ্নিবীজ,
প্রতি নিঃশ্বাসে আমি দগ্ধ হই—
তবু মুক্তির প্রার্থনা করি না।
কারণ জানি, সেই দহনেই আছে শান্তি,
সেই দহনেই জীবনের রস।
---
অধ্যায় ৩ : প্রাপ্তির মরীচিকা
তুমি বলেছিলে—
“ভালোবাসা মানে ছায়া।”
আমি বিশ্বাস করেছিলাম,
কিন্তু ভুলে গেছিলাম—
ছায়া কেবল আলোর পাশে বাঁচে,
অন্ধকারে নয়।
তুমি যখন এলে,
তোমার চোখে ছিল দূরত্বের নীল,
তোমার ঠোঁটে অদৃশ্য অবসাদ।
তুমি আগুন দিলে, কিন্তু নিভানোর বৃষ্টি রাখলে না।
তখনই বুঝেছিলাম—
তোমায় পাওয়া মানে নিজেকে হারানো,
এমন এক বিসর্জন,
যেখানে লাভের মানেই ক্ষতি।
---
অধ্যায় ৪ : হারানোর দেবতা
রাত্রির নির্জনতায় নেমে এল এক দেবতা—
নাম তার অভাবেশ্বর,
যে প্রেমিকের হৃদয়ে আঘাত করে
যখন সে ভাবে— সে পেয়েছে।
সেই রাতে তিনিও এলেন।
তোমার হাসি হারাল আমার বুকে,
তোমার সুবাস মিশল অন্য কারও নিশ্বাসে।
আমি তখন নীরব এক যুদ্ধক্ষেত্র—
যেখানে জয় মানে বিলয়,
আর পরাজয় মানে অস্তিত্ব।
---
অধ্যায় ৫ : বিভৎস হারানো
তোমাকে কেউ একজন পেয়ে গেল।
আমি শুনেছিলাম, তার চোখে প্রতিফলিত হয় তুমি—
যেভাবে একদিন আমার চোখে হয়েছিলে।
আমি হাসলাম…
কারণ জানতাম—
তাকে তুমি দেবে ফুলের গন্ধ,
আমাকে দিয়েছিলে জ্বালার শান্তি।
তোমার প্রাপ্তি তার,
কিন্তু তোমার আত্মা এখনো আমার বুকেই জ্বলে—
এক নিঃশব্দ দহন হয়ে।
---
অধ্যায় ৬ : দহনপুরাণ
আমি এখন এক নির্জন মন্দির—
তোমার প্রতিমা পাথরের,
আর পূজার অগ্নি আমি নিজেই।
আমার জিহ্বায় তোমার নাম উঠলেই জ্বলে আগুন,
আমার বুকের নদীও ধোঁয়ায় ভরে যায়।
তুমি না পেলে আমি শেষ—
তবু বুঝেছি,
শেষও এক প্রার্থনা,
শেষও এক জন্ম।
আমি এখন আগুনে স্নান করি—
নিঃশেষ হওয়ার সাধনায় খুঁজি অমরত্ব।
---
অধ্যায় ৭ : পরিণতি – আত্মার অগ্নিকুসুম
এখন আমি কেবল ছাই।
বাতাসে ভেসে বেড়াই তোমার পথের উপর।
যেদিকে তুমি হাঁটো,
সেই পথে ফুল ফোটে—
লাল, উজ্জ্বল, দগ্ধ।
মানুষ তাকে বলে অগ্নিকুসুম।
তুমি অন্য কারও চোখে হাসো,
তবু জানো—
তোমার প্রতিটি হাসির নিচে আমি রয়েছি ছাই হয়ে।
কারণ ভালোবাসা মানে পাওয়া নয়,
ভালোবাসা মানে—
নিজেকে জ্বালিয়ে কারও রূপে আলো হয়ে থাকা।
---
সমাপ্তি : আত্মার স্বর
আজ বুঝি, ভালোবাসা কোনো প্রাপ্তি নয়,
এ এক অন্তহীন যাত্রা—
যেখানে আগুনই আশ্রয়,
আর ছাই-ই মুক্তি।
তুমি যদি কখনো ফিরে তাকাও,
দেখবে— আমি নেই,
আছে শুধু এক দহন,
যা এখনো তোমার নামে জ্বলে।
---
২২-১০-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।