"দগ্ধ পাখির উড়ান"
- অনুপ কুমার বিশ্বজিৎ

--- আর ফেরা হবে না

মনে হয় — আর ফেরা হবে না।
এই কুয়াশার ভারে নুয়ে পড়া সকাল,
যে সকাল একদিন রোদের সোনালী আঁচলে
মুছে দিত নিদ্রাহীন রাতের ক্লান্তি,
আজ সেই রোদ আমার জানালায় আর নামে না।

গোধূলির সূর্য, যে হাসত আমার দিকে,
সে আজ নির্লিপ্ত দিগন্তের পার থেকে
নিভে যায় ধীরে ধীরে, আমার নাম না ডেকে।

সব হারিয়ে গেছে —
যেন ভালোবাসার পৃথিবীটাই মুছে গেছে সময়ের মানচিত্র থেকে।
যেখানে তুমি আছো, সেখানে সুবাস আছে,
কিন্তু তা পৌঁছায় না আমার নিঃশ্বাসে।

শিশির কণা আজও নামে,
তৃণের ডগায় নিমন্ত্রণ জানায় নিঃশব্দ মিলনের,
তবু আমার চারপাশে কেবল আগুনের গন্ধ।

শুনেছিলাম কেউ আসবে, দেবে শান্তি,
কিন্তু সে আসেনি —
হয়তো হারিয়ে গেছে সময়ের অন্য প্রান্তে।

এই যে বর্তমান — অতীত ও ভবিষ্যতের ফাঁদে জড়ানো,
আমি যেন ধরার এক নীরব ভোজ,
যেখানে দুঃখ, স্মৃতি, আর সময়
আমার মাংসে কেটে নেয় নিজের অংশ।

আর ফেরা হবে না —
না প্রিয়জনের কাছে, না সেই নিস্তরঙ্গ শান্তির তীরে।
যেখানে তুমি আছো, সেখানে হয়তো আলো আছে,
কিন্তু আমার পৃথিবী কেবল ছায়ায় ভরা।


---আমি পাখি হবো

আমি পাখি হবো —
যখন পৃথিবীর সব শব্দ থেমে যাবে,
যখন ভালোবাসা নিঃশব্দ আলো হয়ে থাকবে বাতাসে,
তখন আমি উড়ে যাবো।

আমি হবো এক নীল শালিক,
যার ডানায় থাকবে না বেঁধে রাখা কোনো দুঃখ,
যে আকাশে হারানো মুখের দিকে উড়ে যাবে
আর ফিরে তাকাবে না কারও দিকে।

যেখানে তুমি আছো — সেই দিগন্তের ওপারে,
আমি যাবো একদিন সেখানে,
হয়তো তোমার গানের ভেতর ঢুকে পড়বো নিঃশব্দে।

তুমি জানবে না — আমি আছি,
তবু প্রতিটি সুরে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে
আমি তোমারই পাশে ঘুরে বেড়াবো।

সকল দুঃখকে বক্ষে নিয়ে
উড়ে যাবো দূর আকাশে —
যেখানে ব্যথাও আলো হয়ে জ্বলে,
যেখানে নিঃসঙ্গতা আর স্বাধীনতা
একই ডানায় মিশে যায়।

আমি পাখি হবো —
যে জানে না মৃত্যু,
যে জানে শুধু উড়তে থাকা
এক অনন্ত আকাশের দিকে,
যেখানে রোদ ছুঁয়ে দেয় প্রিয়জনের মুখ
আর কুয়াশা হয়ে ওঠে চিরচেনা আলিঙ্গন।


--বিদায় পৃথিবী

আর রেহাই দিলো না কেউ —
না সমাজ, না রাষ্ট্রের ভয়,
মানুষ এখন বিজ্ঞপ্তি শুধু,
বিবেক হলো সরকারি বই।

রাষ্ট্র এখন এক লৌহদরজা,
ভালোবাসা যার বাইরে পড়ে,
সমাজ হলো সেই প্রহরী,
যে ভয়ে নিজেকেই ধরে।

আমি লিখেছিলাম “মানুষ” শব্দটি,
তারা বলল — “এটা বিদ্রোহ।”
আমি গেয়েছিলাম প্রেমের গান,
তারা বলল — “এই সুর নিষিদ্ধ, রোধ!”

আর রেহাই দিলো না কেউ,
এই পৃথিবী ক্লান্ত, কংক্রিটের হাড়ে,
যেখানে রক্ত শুকিয়ে যায়
সময়ের প্রিন্টারে তারিখ হয়ে দাঁড়ায় মাড়ে।

বিদায় পৃথিবী —
তোমার আকাশে এখন ধোঁয়ার ফুল,
তোমার বাতাসে কর্পোরেট গান,
তোমার নদীতে বয়ে চলে নোটের স্রোত,
মানুষ হারিয়েছে হৃদয়ের প্রাণ।

তবু আমি যাবো —
সকল দুঃখ বুকে নিয়ে,
উড়ে যাবো দূর আকাশে —
যেখানে শব্দ মানে মুক্তি,
যেখানে ভালোবাসা মানে বিপ্লব,
আর মানুষ — মানেই আলো।

যখন কোনো ক্ষুধার্ত শিশু
পাঠ্যবইয়ের ভাঁজে পাবে আমার কবিতা,
তখন সে হাসবে,
আর বলবে ধীরে —
“সে বিদায় নেয়নি,
সে শুধু উড়ে গেছে।”


২৭-১০-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।