নিষিদ্ধ উপকূল
- অনুপ কুমার বিশ্বজিৎ

তোমার শহরটা ছিল এক জোনাকি ভরা বন,
যেখানে আমি এক সময় আলো কুড়োতাম হাতে,
তোমার হাসি ছিল নদীর কলকল ধ্বনি,
যার স্রোতে আমি ভেসে যেতাম নিরুদ্দেশে।

কিন্তু একদিন সেই নদী শুকিয়ে গেল —
হয়তো সময়ের খরায়,
অথবা তোমার নীরবতার বালুচরে।
আর আমি তখন দাঁড়িয়ে রইলাম,
এক তৃষ্ণার্ত নৌকার মতো,
যার পাল ভিজে আছে অপ্রাপ্তির বৃষ্টিতে।

তোমার শহর ছিল আমার ঋতুদের রাজধানী।
তোমার চোখের ভেতরেই ফুটত আমার বসন্ত,
তোমার চুলের গন্ধে নামত শরতের হাওয়া।
আর যখন তুমি রাগে মুখ ফিরিয়ে নিলে,
শীত এসে বসত আমার ভেতর —
নীরব, কাঁপা, অথচ অবিশ্বাস্য সুন্দর।

আমি জানি, এখন সেই শহরটা বদলে গেছে।
তোমার জানালায় অন্য আলো জ্বলে,
তোমার আকাশে এখন অন্য পাখি ওড়ে।
আমার নামটা হয়তো পড়ে আছে
তোমার পুরনো খাতার ধুলো মাখা পৃষ্ঠায়,
যেখানে তুমি একদিন লিখেছিলে — “চিরদিন…”
কিন্তু সময় কলমের কালি মুছে দিয়েছে,
বাকি আছে শুধু বিন্দুমাত্র ব্যথা,
যা এখনো ঝুলে আছে তোমার আকাশের কিনারায়।

আমি যখন তোমার শহর ছেড়ে গেলাম,
রেললাইনে সেদিন কুয়াশা ছিল ঘন,
প্রতিটি ধোঁয়া যেন আমার নিঃশ্বাস হয়ে উড়ছিল।
আমি তাকিয়ে ছিলাম শেষবার,
আর দেখেছিলাম —
তোমার শহরটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে দূরত্বের ধূসর ক্যানভাসে,
যেন এক চিত্রকরের ভুলে যাওয়া রঙ।

এখন তোমার শহর আমার কাছে এক পুরোনো স্বপ্ন,
যেখানে ঢুকলেই বৃষ্টি নামে,
আর প্রতিটি গলিতে শোনা যায় তোমার পদধ্বনি।
আমি জানি, সেগুলো কেবল স্মৃতির প্রতিধ্বনি,
কিন্তু আমার হৃদয় এখনো বিশ্বাস করে —
তুমি একদিন ফিরে আসবে,
একটি বৃষ্টিভেজা বিকেলে,
যখন পৃথিবীটা একটু থেমে যাবে,
আর সময় নরম হয়ে যাবে আমাদের মতোই।

কিন্তু না…
আমি জানি, সেই দরজা এখন বন্ধ,
তোমার শহরের পথে এখন কাঁটাঝোপ আর নিস্তব্ধতা।
তবুও, মাঝরাতে যখন চাঁদটা মেঘের আড়াল ভাঙে,
আমি দেখি —
তোমার শহর এখনো জ্বলে,
দূরে, অচেনা অথচ চিরচেনা আলোয়।

তাই আজ শেষবারের মতো লিখে রাখলাম—

তোমার শহরের আমার আগমন চিরদিনের জন্য বন্ধ হলো।
তবু আমার মন এখনো সেই শহরের বাতাসে ভাসে,
যেন পরিযায়ী পাখি,
যার নিজের কোনো আকাশ নেই,
তবু বারবার ফিরে আসে —
সেই একই পুরোনো গোধূলির রঙে…


১২-১১-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।