শেষ চিঠি
- অনুপ কুমার বিশ্বজিৎ
শেষ চিঠিটা হয়তো আমারই ছিলো—
একদম শেষবারের মতো
নিজেকে সামলে নিয়ে লেখা কিছু এলোমেলো কথা,
যেখানে আমি তোমাকে বলেছিলাম
আমার ভেতরের নীরবতাগুলো কেমন করে
ধীরে ধীরে আমাকে গিলে খাচ্ছিলো।
কিন্তু সেই চিঠি তো পৌঁছালো না তোমার কাছে—
না ডাকপিয়ন তার পদচিহ্ন রেখে গেলো,
না বাতাস তার ফিসফিসে কণ্ঠে তোমার জানালায়
কখনো ঠোকাঠুকি করলো।
সে যেন মাঝরাস্তায় পথ ভুলে গেলো—
হয়তো ভেজা রাস্তায় পড়ে ভিজে কাগজ হয়ে গেছে,
হয়তো কারও অচেনা হাতে এসে
অপরিচিতের অপেক্ষায় থেমে গেছে।
আর আমি?
আমি শুধু দেখলাম—
কিছু না-বলা বাক্য কেমন করে
আমার বুকের ভেতর জমে
পাথর হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।
বড়োই আফসোস রয়ে গেলো—
জন্ম থেকে আজকের প্রতিটা মূহূর্ত পর্যন্ত
যে কথাগুলো শুধু তোমাকেই বলতে চেয়েছি,
সেগুলো ঠিক সময়ের অভাবে
মুছে গেলো, থেমে গেলো, ছিঁড়ে গেলো।
আফসোস—
কারণ সেই চিঠিতে আমি লিখেছিলাম
আমার সব ভুলগুলোর কথা,
সব ভুল বোঝাবুঝির ক্লান্তি
আর তোমাকে হারানোর ভয়
যেটা দিনের পর দিন আমাকে নিঃশব্দে
খেয়ে ফেলছিলো ভেতর থেকে।
আফসোস—
কারণ সেই চিঠির ভাঁজে ভাঁজে
আমি রেখেছিলাম ক্ষমা চাওয়ার শব্দ,
যা হয়তো তোমার একটুখানি হাসি আনতে পারতো।
কিন্তু তুমি তো দেখলে না—
তুমি জানতেই পারলে না
আমি কতটা বলতে চেয়েছিলাম,
কতটা রেখে গিয়েছিলাম তোমার কাছে।
তবে,
তোমার জন্য লেখা ওটাই ছিলো
আমার শেষ চিঠি—
শেষবারের মতো তোমাকে জানানো
যে আমি তোমায় হারাতে চাইনি কখনো,
শুধু জীবনটাই হয়তো
অন্যদিকে টেনে নিয়ে গেছে আমাদের।
সেই চিঠির কালি এখনো শুকায়নি—
হৃদয়ের ভেতর কোথাও ভাসছে
কিছু এখনও-জ্বলন্ত বাক্য,
কিছু অসমাপ্ত অনুরোধের রেখা,
কিছু ভাঙা দিনের পায়ের শব্দ।
তুমি না পড়লেও,
আমি জানি চিঠিটা বেঁচে আছে—
একটা দীর্ঘশ্বাসে,
একটু নরম যন্ত্রণায়,
একটা রাতের মাঝপথে
অশব্দে ঝরে পড়া স্মৃতির মতো।
আর আমি?
আমি আজও ভাবি—
যদি সেই চিঠিটা ঠিক তোমার হাতে পৌঁছাতো,
তবে কি সবকিছু অন্য রকম হতো?
নাকি সময় তার নিজের জেদে
তবুও আমাদের দুজনকে
দুটি ভিন্ন পথে হাঁটাতে তুলতো?
—
শেষ চিঠির অপূর্ণতার এই দীর্ঘ গল্প
আমার নীরব হৃদয়ে এখনো বেজে ওঠে—
একটা নরম ব্যথার মতো,
একটা চিরঅমলিন স্মৃতির মতো,
যা আমি হারাতে চাই না,
ভুলতেও চাই না।
২৬-১১-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।