পদ্মনিশির ছায়া
- অনুপ কুমার বিশ্বজিৎ
তারার মেলা লুকিয়ে রেখেছি এই মনের ডগাতে—
প্রতিটি তারা যেন বহুদিনের অচেনা হাহাকার,
মেঘের পিঠে উঠে পতঙ্গের মতো নিভে যায়
অন্ধকারের কোলে জমা পুরোনো আলো।
রাতের গহিনে শুরু হয় রক্তখেলা—
নদীর ভেতর লাল চাঁদের গন্ধ,
ধানের শিষে শিষে জমে ওঠা শিউরে ওঠা হাওয়া,
যেন পৃথিবী বহুদিন ধরে নিভৃতে কাঁদছে
কেউ না দেখলেও।
স্বার্থকী তুই—
এই পানার ছায়ার নিচে, নদীর পাটাতনে
অপেক্ষায় আছি রণে নেমে আসার মতো।
রাঙা দেহে যে আলো লেগেছে,
তা কবে থেকে জানি না—
হয়তো কোনো বিস্মৃত বিকেলের রোদ,
হয়তো কোনো গভীর ক্ষত,
হয়তো কেবলই কল্পনার লাল দ্যুতি
যা আমরা নিজেরাই বছর ধরে তৈরি করি।
জলের কিনারায় দাঁড়িয়ে
শুনতে পাই দূরের কাঁকফুলে ঝরে পড়া ফোঁটার শব্দ—
এ শব্দে রাত আরও গভীর হয়,
আর আমি আরও একা হয়ে যাই।
পদ্মের লতায় লতায় থাকে কত যে কাঁটা—
জীবনও কি ঠিক তেমন নয়?
যেখানে প্রতিটি স্পর্শের ভেতর
একটু ব্যথা লুকিয়ে থাকে,
একটু আলো, আর একটু আঁধার।
সেই কাঁটাই সরাতে
কলকা আঁকা হাতটা বাড়িয়ে দিই জলে—
জলে ছড়িয়ে পড়ে আমার হাতের রেখা,
যেন হঠাৎ মনে হয়
নদীও কখনো কখনো মানুষের মতো
অতীতকে ধরে রাখে,
ফেলে দিতে পারে না।
দূরের কাশবনে
বাতাস থেমে থেমে বলে যায় পুরোনো কথামালা—
কেউ নেই, তবু একটা কান্নার সুর
জমে আসে রাত্রির কাঁপা পাতায়।
আরও দূরে,
ঘাসফড়িং দাঁড়িয়ে থাকে
ভেজা শিশিরের ওপরে—
যেন এই পৃথিবীর ক্লান্ত শরীরে
একটা ক্ষুদ্র সবুজ শ্বাস।
নদীর ধার ঘেঁষে
ঘুমিয়ে পড়ে কিছু ভুলে যাওয়া স্মৃতি—
তাদের নিঃশ্বাসে ধুলো,
তাদের চোখে নিভে যাওয়া নীল জোৎস্না।
তবু তারা জেগে ওঠে—
যেমন জেগে ওঠে ভোর।
প্রভাতের প্রথম আলো নামলে
দেখি, কুয়াশার বুক ভেদ করে ওঠে
একটি নিঃশব্দ রোদ,
রোদ যার কোনো উল্লাস নেই,
তবুও সে নরম গরমে
ছুঁয়ে যায় জলের গা,
শীতল পাতার পিঠ,
স্বপ্নে জড়ানো আমার হাত।
জীবনও বোধহয় এমনই—
দীর্ঘ রাতের ক্লান্তি,
কাঁটা ভরা পথ,
আর শেষে একটুখানি উষ্ণ আলো—
যা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
রক্ত, ব্যথা, স্মৃতি, আর আশা—
সব মিলিয়ে ফুটে ওঠে
পদ্মফুলের মতো এক নীরব জীবন—
যা কখনো বলে না কিছু,
তবু সবই বুঝিয়ে দেয়
তার লাল, নিভৃত বিস্ময়ে।
২৬-১১-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্যসমূহ
এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।

মন্তব্য যোগ করুন
কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।