অনিন্দিতা
- ইসমাইল আহসান তুহিন

কফিশপটার কাঁচের জানালায় সন্ধ্যার আলো নরম হয়ে বসেছিল।
বাইরে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি, ভেতরে কফির ধোঁয়া আর স্মৃতির গন্ধ।
তিন বছর পর, হঠাৎ—
দীপেন আর অনিন্দিতা মুখোমুখি।

প্রথমে দুজনেই একটু চুপ। যেন শব্দগুলো কোথাও জমে আছে, বেরোতে লজ্জা পাচ্ছে।

দীপেন:
“আরে অনিন্দিতা যে, তুমি এখানে?
কেমন আছো?”

অনিন্দিতা হেসে, চোখ নামিয়ে বলল:
“ভালো আছি বললেই কি ভালো থাকা হয়?
তবু… বেঁচে আছি। তুমি?”

দীপেন কফির কাপটা হাতে নিলো, যেন উষ্ণতা খুঁজছে।
“আমি… কাজ করি, ঘুমাই, মাঝে মাঝে পুরোনো গান শুনি।
আর মাঝে মাঝে তোমার কথা মনে পড়ে—
যখন হঠাৎ বৃষ্টি নামে, বা কোথাও নীল শাড়ি দেখি।”

অনিন্দিতা চুপ করে রইলো। তার আঙুল কাপে জমে থাকা পানির রেখা ছুঁয়ে দিলো।
আড়চোখে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো:
“আমি নাকি খুব ঘাড়ত্যাড়া ছিলাম, মনে আছে?”
“সবসময় ভেবেছিলাম, আমি যতই অবহেলা করি তুমি আছোই…
তাই তোমাকে যতটা কষ্ট দিয়েছি, ওই সময়ে ততটা বুঝতে পারিনি।”

দীপেন তাকিয়ে রইলো।
“তুমি চলে গেলে… আমি শিখলাম, কেউ চিরকাল থাকে না।
কিন্তু তোমার সঙ্গে কাটানো অসম্ভব সুন্দর বিকেলগুলো—
ওগুলো কোথাও যায়নি।”
“কতো জায়গায় ঘুরে বেড়ানো, হাসি, কান্না, মান অভিমান,
সব.. সবই স্মৃতি হয়ে গেঁথেই রয়ে গেলো।

কফিশপের ভেতর বাজছিল ধীর সুরের গান।
অনিন্দিতা বললো,
“মনে আছে, আমরা এইরকম এক কফিশপে বসে ভবিষ্যতের বাড়ির নাম ঠিক করেছিলাম?
তুমি বলেছিলে, বারান্দায় একটা দোলনা থাকবে…
আর আমি বলেছিলাম, টবে টবে জবা ফুল।”

দীপেন মৃদু হেসে বললো,
“আমি এখনও দোলনা দেখলে দাঁড়িয়ে যাই।
ভাবি—তুমি থাকলে দোলটা একটু ঠেলতাম।”
তুমি বলেছিলে:
বেলকনিতে বুকশেলফ রাখবে আর টবে টবে অপরাজিতার গাছ,
আমার বেলকনিতে এখনো বুকশেলফ, অপরাজিতার গাছ গুলোয় ফুল ফুটেছে, কিন্তু তুমি....

একটু নীরবতা।
বৃষ্টি তখন জোরে পড়ছে।

অনিন্দিতা ধীরে ধীরে বললো:
“আমি তোমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম…
কারণ ভেবেছিলাম, অন্য কোথাও আমি বেশি স্বাধীন হবো।
কিন্তু স্বাধীনতা মানে একা হয়ে যাওয়া—এটা বুঝতে দেরি হয়ে গেল।”

দীপেন দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“আমি তোমাকে দোষ দিই না।
তুমি ছিলে আমার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
সব গল্প শেষ পর্যন্ত একই থাকে না।”

অনিন্দিতা চোখ তুলে তাকালো।
চোখে একটু জল, একটু হাসি।
“আমরা কি আবার বন্ধু হতে পারি?”

দীপেন বললো,
“বন্ধু…?
হয়তো।
কিন্তু তোমার জন্য আমার ভেতরে যে জায়গাটা আছে,
ওটা শুধু নাম বদলায় না—
সময় বদলায়, তবু ওটা থাকে।”

ওয়েটার বিল রেখে গেল।
দুজনেই উঠে দাঁড়ালো।

বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে।
রাস্তার বাতিতে ভেজা পথ চকচক করছে।

অনিন্দিতা বললো,
“ভালো থেকো, দীপেন।”

দীপেন মৃদু হাসলো,
“তুমিও।
আর… কখনো যদি খুব একা লাগে,
জেনে রেখো—
কোনো এক কফিশপে,
একটা পুরোনো বিকেল এখনও আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে।”

২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ইংরেজি

@অনিন্দিতা
হবিগঞ্জ, সিলেট

#তুহিনেরকলম
#কবিতা_সংগ্রহ


২৭-০২-২০২৬
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।