হৃদয়দান
- প্রসূন গোস্বামী

একটি গলিপথ—মেঘে মোড়ানো,
সেইখানে হাঁটে এক রাজা, তাঁর তলোয়ার আজ বিস্মরণে।
এক কিশোরী, বয়স একাদশ, চোখে কল্পলোকের খেলা,
সে জিজ্ঞাসে—
“বাবা, আমার পনেরো বছরে কী দিবে তুমি?”
বাবা হেসে বলে—
“এখনো তো অনেক কাল বাকি, বৃষ্টির ভেতর রোদ্দুর বুনে রাখো।”

চৌদ্দর কনে হতেই
সে লুটিয়ে পড়ে—
প্রাচীন রাজ্যের মন্দিরে যেমন ভেঙে পড়ে শিলালিপি,
ডাক্তারবাবু তখন দেবতার মতো বলেন—
“হার্টটা… খুবই দুর্বল।
শক্তি নেই আর, জীবনটা শেষ পর্যায়ে।”
ঘরের কোণে, কাঁপতে থাকা প্রদীপের পাশে,
বাবার ছায়া—
ভাঙা রথের চাকা টেনে নিয়ে যায় অন্ধকারে।

মেয়েটি জিজ্ঞেস করে, চোখে অসীম রাত:
“আমি কি মরব, বাবা?”
আর এক বেদনার বাজিকর বলে—
“না, তুই বাঁচবি… আমি জানি।”
সে বলে না— কেমন করে সে জানে!
তীর্থযাত্রার মতো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে
সে চলে যায়— অস্তিত্ব রেখে হৃদয়ের ভিতর।

পনেরো বছর পূর্ণ হলে
মেয়েটি ফেরে—
হাসপাতালের গন্ধ ছুঁয়ে ফেরে তার ছেলেবেলার ঘরে।
তখন সে দেখে—
বিছানার কোণে সোনালি খামে লেখা এক পত্র—
পুরোনো দিনের রাজা যেন ত্যাগ করেছে
তার শেষ যুদ্ধের তরবারি।

চিঠিতে লেখা—
“যদি তুই পড়ছিস এই পত্র,
তবে বুঝে নিস—
আমার বুক তোর ভিতর জেগে আছে।
সেই উপহার—
তুই চেয়েছিলি পনেরো বছরে।
আমি তখন জানতাম না, কী দিব,
আজ জানি—
আমার হৃদয়,
তোর জন্মদিনের প্রকৃত উপহার।”

আর শহর তখনও জানে না,
কোনো বাবা—
নিজেকে গোপন রেখে কীভাবে
তৈরি করেন প্রেমের সবচেয়ে প্রাচীন পুরাণ।
একটা শালগাছের নিচে বসে কাঁদে সে শহর—
মাটি জানে, রক্ত জানে,
বুকের ভিতর নদী বয়ে চলে এক অলিখিত স্রোতে।

জানিস, মেয়ে,
এখন আর কেউ তার হৃদয় বিকিয়ে দেয় না ভালোবাসায়।
সব বাবা এখন কেবল স্প্রেডশীটে রাখে সন্তানের চাওয়া।
কিন্তু সে এক লোক—
যে হৃদয় উপহার দিয়েছিল,
তোর চোখে সে ছিল শুধু বাবা,
এই শহরের চোখে,
সে এক প্রাচীন মহাকাব্যের অমর রাজা।


০৯-০৬-২০২৫
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।