ভালোবাসার ভাষাহীনতা
- পাপন বসুনিয়া

আমি ভালোবাসতে জানি—
ঠিক যেমন শরৎ জানে শিউলির গন্ধ ছড়াতে ভোরের নিস্তব্ধতার ভিতর,
ঠিক যেমন নদী জানে বহমান থাকতে,
তবু তার জল কোনোদিন নিজের নাম উচ্চারণ করে না;
আমার বুকের গহীনে জন্ম নেয় অগণিত নীল অনুভূতি,
কিন্তু জিহ্বার প্রান্তে এসে তারা হঠাৎই ভেঙে পড়ে—
অক্ষরের কাঠামোয় ধরা দেয় না, বাক্যের ঘরে আশ্রয় পায় না।

আমি তোমাকে দেখেছি—
ধানক্ষেতের ওপরে ঝুলে থাকা শেষ বিকেলের মতো নিঃশব্দে,
যেখানে আলো থাকে, অথচ দিনের দাবি আর নেই;
আমার চোখে তখন প্রেম ছিল, কিন্তু কণ্ঠে ছিল না তার প্রমিত উচ্চারণ,
আমি চেয়েছিলাম বলতে— “থেকে যাও”,
কিন্তু বলেছি কেবল— “ভালো থেকো”;
এই সামান্যতার ভিতরেই হয়তো আমার সমস্ত ব্যর্থতা লুকিয়ে আছে।

ভালোবাসা আমার কাছে কোনো প্রদর্শনের বস্তু নয়—
সে আসে ঝরে পড়া পাতার মতো,
যার শব্দ শোনা যায় না, অথচ উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না;
আমি তোমাকে চাইনি চিৎকারে,
চাইনি আলো জ্বেলে সভার মাঝখানে দাঁড়িয়ে,
আমি চেয়েছি নিঃশব্দে—
রাতের জানালার পাশে বসে থাকা এক দীর্ঘ অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষার মতো।

কিন্তু পৃথিবী তো শব্দ চায়,
সে চায় ঘোষণা, প্রমাণ, দৃশ্যমান উৎসর্গ—
আর আমি পারিনি প্রেমকে সেই রূপ দিতে;
আমার ভালোবাসা রয়ে গেছে নদীর তলায় জমে থাকা অচেনা স্রোতের মতো,
যার অস্তিত্ব আছে, কিন্তু মানচিত্রে কোনো দাগ নেই।

আমি ভালোবাসতে পেরেছি—
কিন্তু তা উপস্থাপন করতে গিয়ে বারবার হেরে গেছি ভাষার কাছে;
শব্দ আমার হাতে এসে হয়েছে অনাথ,
তারা জানেনি কীভাবে তোমার দিকে হাঁটতে হয়।

তাই আজও আমি দাঁড়িয়ে থাকি দূরের কোনো শূন্য মাঠে,
যেখানে কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যায় সমস্ত না-বলা বাক্য;
তোমার দিকে বাড়ানো আমার হৃদয়
ফিরে আসে নিজের কাছেই—
একটি অসম্পূর্ণ চিঠির মতো,
যার ঠিকানা ছিল,
কিন্তু পাঠানোর ভাষা ছিল না।


২৭-০১-২০২৬
রকমারি থেকে বই কিনুন
মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ

এখানে এপর্যন্ত 0টি মন্তব্য এসেছে।