আজ ৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, মঙ্গলবার

রকেট
- ACHINTYA SARKAR/অচিন্ত্য সরকার[পাষাণভেদী]

রকেট
অচিন্ত্য সরকার

দীপাবলির রাত,আলোতে আলোতে ঝলমল করছে দশ দিক।পাড়ায় পাড়ায়,রাস্তার মোড়ে,বাড়ির ছাদে সর্বত্র বাজি পটকা ফাটাচ্ছে,রঙ মশাল জ্বালাচ্ছে ছেলে মেয়েরা।বারুদের গন্ধ, আলো আর খুশি মিশে,মুহুর্তটা যেন একেবারে বেলাগাম।
মন্টা,সোনাই আর বাপ্পা,মন্টাদের দোতালার বিশাল ছাদে বাজি ফাটাচ্ছে।সোনাই ও বাপ্পা প্রতিবছর
এখানে আসে,ওদের মা মন্টাদের বাড়িতে কাজ করে কিনা।ওদের বাবা নেই,ছাদ ও নেই,পাশের বস্তির একটা ছোট্ট ঘরে ওরা থাকে।বাপ্পা সেভেন-এ পড়ে, বিকেল থেকে রাত ন'টা অবধি পাশের এক ঘুগনী রুটির দোকানে কাজও করে।ওর খুব ইচ্ছা আকাশে দাগ কেটে চলা রকেটে একবার চড়বে।সোনাই বস্তির খিচুড়ী স্কুলে পড়ে। মন্টা মহিম বাবুর একমাত্র ছেলে,এবার তার কে.জি.-টু হলো।মহিম বাবু শিয়ালদহ শাখায় রেলের মস্ত অফিসার।মন্টার মা বাপ্পাদের স্কুলের ইতিহাসের ম্যাডাম।মন্টার তো খেলার সাথী নেই।পাড়ার ছেলেমেয়ের সাথে বিশেষ মেশে না।তাই বিশেষ বিশেষ সময়ে বাপ্পা আর সোনাই মা'র সাথে চলে আসে।মন্টার মা অবশ্য বলেই দেয়,কবে আসতে হবে।
নানা রকম দামি দামি বাজি কিনে দিয়েছেন ছেলেকে মহিম বাবু।চরকি,ফুলঝুরি,ট্রেন বাজি,রকেট বাজি,তুবড়ি,তারাবাজি রংমশাল কি নেই!মন্টা নিজে কিছুই ফাটাতে পারে না,ওর বাবা মা ফাটাতেও দেয় না।বাপ্পা,তারাবাজি,রঙ মশাল এগুলো ধরিয়ে ওর হাতে দেয়,ও সে গুলো ধরে হাত লম্বা করে ,চোখ পিট পিট করে আর হাসে।বাকি বাজি গুলো সবই প্রায় বাপ্পা আর সোনাই ফাটায়।কখনও কখন ও বড়রাও থাকে।
মহিম বাবু একটু আগেই ছাদ থেকে নেমে গেলেন।নামার আগে বললেন,"বাপ্পা,মন্টা কে দেখিস,সাবধানে ফাটাবি,মন্টা সোনা,দুষ্টুমি করবে না..."একটু পরেই মন্টা জিদ ধরল,"বাপ্পা দা,এবার রকেট বাজি ওঠাও..ফাটাও না" কয়েকবার বলার পর প্যাকেট কেটে কয়েকটা রকেট বাজি বের করল।একটা কে বোতলের মধ্যে রেখে সোনাই এর হাত থেকে জ্বলন্ত মোমবাতিটা নিল।মন্টা ও সোনাই পাশে দাঁড়িয়ে ঘাড় লম্বা করে দেখছিলো।বাপ্পা দৃঢ় ভাবে বলল,"তোরা দূরে সরে যা,কোন দিকে উঠবে বলা যায় না"।
রকেটের পলতে টা প্রথমবার ধরল না দেখে,বাপ্পা একটু ঝুকে পড়ে ওটা ধরানোর জন্য মনোনিবেশ করল।পলতে সবে ধরেছে,পেছেন থেকে মন্টার ডাকে,একটা মূহুর্ত মনোসংযোগ হারালো বাপ্পা,আগুনে রকেটা সর্ব শক্তি নিয়ে বিঁধে গেল ওর গলার কাছে,ছাদে রক্তের দাগ কেটে ছটপট করতে লাগল সে.....নিচে আরতির ঘন্টা ধ্বনীর সাথে তাল মিলিয়ে, বাপ্পার মা শাঁখ বাজাচ্ছে মনীবের মঙ্গল কামনায়......
খুব ঘাবড়ে গেছে মন্টা আর সোনাই,ঘোর কাটতেই তারা চিৎকার শুরু করে,কেও আসছেনা দেখে,সোনাই আর মন্টা কাঁদতে কাঁদতে নিচে নামে।
‌ আধ ঘন্টারও বেশি সময় লেগে যায় বাপ্পাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে...... বস্তির শিশুর গায়ে আর কতই বা রক্ত থাকবে..... ডাক্তার দেখে বললেন,"
স্যরি,ইটিস টু লেট......."
বাপ্পার মা শুধু চেয়ে আছে,এক অদ্ভুত শান্ততা তার দৃষ্টিতে। চোখে জল নেই,মুখে কথা নেই....মন্টাই এর বাবা মা বললেন,"ভাগ্যিস,মন্টার গায়ে লাগিনি।চিন্তা করিসনে,রমা, ...... আমরা তো আছি........

মন্তব্য যোগ করুন

কবিতাটির উপর আপনার মন্তব্য জানাতে লগইন করুন।

মন্তব্যসমূহ